শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

বাংলা কবিতায় ঈদ

রুহুল আমিন বাবুল : মানুষের আত্মার সাথে মেশানো এক পবিত্র অনুভূতির নাম ধর্ম। এই পবিত্র অনুভূতি নিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি উন্নত ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে সমৃদ্ধ সাহিত্য। ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে সাহিত্য রচনা করে যাঁরা বিশ্বখ্যাত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ওমর খৈয়াম, ইমরুল কায়েস, হাফিজ, বাহাদুর শাহ জাফর, মির্জা গালিব, জালালউদ্দিন রুমী, মহাকবি ইকবাল, জিগর মুরাদাবাদী, হেয়াত মাহমুদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ঈদ বিশ্ব মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। দুটি ঈদ উৎসবের মধ্যে প্রথমটি হলো ‘ঈদ-উল-ফিতর’ এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘ঈদ-উল-আযহা’। এই দুটি ঈদ নিয়ে মধ্যযুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রচুর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক যুগের খ্যাতিমান কবি শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, কাজী লতিফা হক ঈদ এবং ঈদের সাথে সম্পর্কিত ‘রমজান’, ঈদের চাঁদ’, ‘কোরবানী’ ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর কবিতা ও ছড়া লিখেছেন।

‘রমজান’, ‘শওয়ালের চাঁদ’, ‘ঈৎ-উল-ফিতর’, ইত্যাদি কবি শাহাদাৎ হোসেনের ‘রূপচ্ছন্দা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা। এসব কবিতার মধ্য দিয়ে কবির ঈদ ও ঈদ সম্পর্কিত চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। ঈদের দিনে মানুষ ভূলে যায় দুঃখ-বেদনার কথা। এদিন ঘটে সাম্যবাদী চেতনার জাগরণ। ঈদ হয়ে ওঠে এক অনাবিল আনন্দের মহামিলন মন্ত্র। সে দৃষ্টান্ত মেলে তাঁর ‘ঈদ-উল-ফিতর’ কবিতায়।

মহাকেন্দ্রে মিলনের মহা-মহোৎসব

ভেদ-দ্বন্দ্ব-দ্বিধা নাই রাজেন্দ্র কাঙালে

সাম্যের বিজয় তীর্থে

মৃত্তিকার আস্তরণে নতশির হবে।

ঈদকে সকলেই মহামিলনের পুণ্য-উৎসব হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। প্রাসঙ্গিক ভাবেই তিরিশের অগ্রজ কবি গোলাম মোস্তফার ‘রক্তরাগ’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঈদ উৎসব’ শীর্ষক কবিতাটির নাম করা যায়।

আজিকে আমাদের জাতীয় মিলনের

পুণ্য দিবসের প্রভাতে

কে গো ঐ দ্বারে দ্বারে ডাকিয়া সবাকারে

ফিরিছে বিশ্বের সভাতে।

পুলকে সদা তাঁর চরণ চঞ্চল

উড়িছে বায়ু ভরে বসন-অঞ্চল

সকল তনু তার শুভ্র-সুকুমার

স্নিগ্ধ স্বরগের আভাতে।

কণ্ঠে মিলনের ধ্বনিছে প্রেম-বাণী

কক্ষে ভরা তার শান্তি

চক্ষে করুণার স্নিগ্ধ জ্যোতি তার

বিশ্ব-বিমোহন কান্তি।

ঈদ ও ঈদ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি কবিতা রচনা করেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ঈদের কবিতায় কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ-বেদনার অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁর ‘ঈদ মোবারক’, ‘কৃষকের ঈদ’, ‘ঈদের চাঁদ,’ প্রভৃতি কবিতার নাম করা যায়,। ‘জিঞ্জির’ কাব্যগ্রন্থে ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় কবি বলেন-

শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,

কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো

বরষের পরে আসিল ঈদ।

ভুখারীর দ্বারে সওগাত বয়ে রিজওয়ানের,

কন্টক বনে আশ্বাস এনে গুল-বাগের

সাকীরে ‘জাম’ এর দিলে তাগিদ।

নজরুল সাম্যবাদী চেতনার কবি। তাঁর ঈদের কবিতায়ও উচ্চারিত হয়েছে সাম্যবাদের আদর্শ ও মানবতার বাণী। ঈদ আনন্দের এ কথা যেমন সত্য, তেমনি গরিব কৃষকের জীবনে বেদনারও বটে। তাই ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় কবির প্রশ্ন!

জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ

মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?

একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার

উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশুর পাঁজরের হাড়?

আসমান জোড়া কালো কাফনের আবরণ যেন টুটে

একফালি চাঁদ ফুটে আছে মৃত শিশুর অধর পুটে।

ঈদের আসল মাহাত্ম্যের ইঙ্গিত মেলে ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায়। বিশ্বনবীর আদর্শ ছিল প্রতিবেশির খোঁজ খবর নেওয়া। দীন-দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা। এ কবিতায় তারই ইঙ্গিত মেলে।

ঈদ নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতাগুলো লিখেছেন তালিম হোসেন। তাঁর কবিতারগুলোর মধ্যে ‘ঈদ মুবারক’, ‘ঈদের পয়গাম’, ‘ঈদের ফরিয়াদ’, ‘ঈদের সন্দেশ’, ‘চিরন্তন ঈদ’, ‘কোরবানীর ঈদ’, ‘ঈদোৎসব’, ‘ঈদ উপহার’, ‘ঈদের চাঁদ’, ‘মুকুলের ঈদ’, ‘আজাদীর ঈদ’, ‘রাজনের ঈদ’, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ‘দিশারী’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঈদের পয়গাম’ কবিতায় কবি তালিম হোসেন ঈদের আনন্দের কথা বলেছেন। ঈদ যেন মানবজীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার পয়গাম নিয়ে আসে।

সুন্দর সুখী মানবাত্মার

প্রশান্ত হাসি-হেলালে ঈদ

আনিল আবার নয়া জামানায়

নতুন জিন্দেগীর তাগিদ।

নিয়ে এল সাথে শিরিণ শিরণী

মন-হরিণীর মেশক-বাস,

আনিল আতর-গোলাপ বৃষ্টি

মধুর, দৃষ্টি, মিষ্টি হাস।

ঈদের পয়গাম মানবজীবনে যেমন আনন্দের বান ডেকে আনে, তেমনি আনে মহামিলনের সুখ। তালিম হোসেনের ‘শাহীন’ কাব্যগ্রন্থের ‘নতুন ঈদ’ কবিতায় রূপায়িত হয়েছে পারলৌকিক জীবনের ইঙ্গিত। ‘ঈদের সন্দেশ’ ও ‘ঈদোৎসব’ রচিত হয়েছে আনন্দময় জীবনের গল্পকথা নিয়ে। ঈদের দিনে মানুষ তার মনের কলুষ-কালিমা দূরে ঠেলে যোগদান করে পুণ্য অর্জনের মিলন মেলায়। সামনে আসে সুন্দর মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তিরিশ বসন্তের ফুল’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঈদ’ কবিতায় এমন অনুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়।

আসো ঈদ

ত্যাগের ইঙ্গিত

এই নীল ভুবনে জানাও।

আমাদের মানুষ বানাও।।

জ্বালো লাল

আলোর মশাল

হৃদয়ের আঁধার নাশুক।

দিকে দিকে শান্তি আসুক।।

ঈদ নিয়ে আরো অনেকে কবিতা ও ছড়া লিখেছেন। তাদের মধ্যে কাজী লতিফা হকের ‘ঈদ এসেছে’, জাহানারা আরজুর ‘বলতে পার ঈদ কোথায়’, আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দিনের ‘ঈদ এসেছে’, নির্মলেন্দু গুণের ‘নেকাব্বরের ঈদ’, শামসুল ইসলামের ‘ঈদ এসেছে’, খালেক বিন জয়েনউদ্দীনের ‘ঈদের পরশ’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

এমনিভাবে ঈদ এবং ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বিশ্বে নানা ভাষায় অসংখ্য কবিতা রচিত হয়েছে। ঈদ শুধু আনন্দ উৎসবই নয়-আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার প্রেরণাও লাভ করা যায় ঈদ উৎসব থেকে। আর সেটা শুরু হয় ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতিপর্ব রমজানের সিয়াম সাধনা দিয়ে। পবিত্র রমজানের একমাস আত্মনিয়ন্ত্রণের পর প্রথম আনন্দ উৎসব ঈদ-উল ফিতর। তারপর আসে ঈদ-উল-আযহা। তাই ঈদ শুধু হালকা আনন্দোৎসবই নয়-জীবন গড়ার উৎসবও। ঈদ নিয়ে রচিত কবিদের কবিতার ভেতর দিয়ে এই আদর্শ জীবন গড়ার কথাই পাওয়া যায়। ##

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *