মঙ্গলবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং |

কারো পিতার নয়, এ ছবি জাতির পিতার

দীপ্ত হৃদ মতিন : ২০০১ সালের ঘটনা। আমি ময়মনসিংহের ভালুকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আমার পোস্টিং হয়েছিলো আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে। এরপর কেয়ারটেকার সরকার আসে। সারা বাংলাদেশ ব্যাপি সরকারি কর্মকর্তাদের বদলির হিড়িক পড়েছিলো।থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক প্রভৃতি পদের কর্মকর্তাগণ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিধায় তাঁদেরকে বদলিয়ে নতুনভাবে পদায়ন করে নিরপেক্ষতা আনয়নের চেষ্টা করা হয়। আমি বদলির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম।
নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করা হয়। আমার বদলি হলোনা। অবশ্য একদিন ডি জি এফ আই এর এক পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন স্যার আপনার বদলি হবে না।কারণ আপনার
বিষয়ে ভাল রিপোর্ট আছে।
নির্বাচনের প্রশাসনিক কাজ পুরোদমে শুরু করেছিলাম। আমার নিজের নিকট আমার শপথ ছিলো সরকার যেহেতু আমাকে নিরপেক্ষ হিসেবে বদলি করেননি আমি বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করবো।
১লা অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ডাঃ আমানুল্লাহ সাহেব বিশ হাজারের অধিক ভোট পেয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে পুনঃ নির্বাচিত হয়েছিলেন।তিনি এর আগের টার্মে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে।তিনি বিরোধী দলের মাননীয় সাংসদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ড.শাহ মোহাম্মদ ফারুক। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। তিনি পরাজিত হয়েও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
আমার যতটা মনে পড়ে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের কোন এক প্রথম প্রহরে আমি অফিসে কাজ করছিলাম। অফিস প্রাঙ্গনের ভেতরে অনেক মানুষের হৈচৈ শব্দ শুনতে পেলাম। কিছু ক্ষণের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সমর্থক এক চেয়ারম্যান দৌঁড়ে দোতলায় উঠে এলেন এবং আমার চেম্বারে আত্মরক্ষার্থে ঢুকে পড়লেন।এমন সময়ে চল্লিশ পঞ্চাশ জন মানুষ আমার চেম্বারে প্রবেশ করেন। আত্মরক্ষার জন্য আমার চেম্বারে আশ্রয় নিতে যিনি এসেছিলেন তাকে এখানে দেখে তাদের রাগ যেনো আরো বেড়ে গিয়েছে।খুবই শান্তভাবে বেসামাল অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলাম।
যারা এসেছিলেন প্রায় প্রত্যেককেই আমি চিনতাম। তাদের মূল দাবী ছিলো অফিসে টানিয়ে রাখা বঙ্গবন্ধুর ছবিটা নামিয়ে রাখতে হবে। তাদের দাবী যতোই জোড়ালো হচ্ছিল তারাও উত্তেজিত হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আমার সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার, বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে তাদের অযৌক্তিক জোড়ালো দাবী শিথিল হয়ে এলো। আমি তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেম যে,এ ছবি সরকারি নির্দেশ মোতাবেক টানানো হয়েছিল এবং সরকারি নির্দেশেই নামতে পারে। আজো মনে পড়ে বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছিলাম “কারো পিতার নয়।এ ছবি জাতির পিতার।”
নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য ও পরাজিত প্রার্থী পরবর্তীতে পৃথকভাবে আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে ঘটনার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।তাঁরা তাদের মনের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। আমি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করেছি।
আমি ভেবে মনে আনন্দ পাই -আওয়ামী লীগ, তত্বাবধায়ক, বিএনপি তিনটি সরকারের আমলে একই উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কয়েক মাস পূর্বে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা ফেরার সময় ভালুকা গিয়েছিলাম সপরিবারে।স্মৃতিময় জায়গা, পরিচিত কিছু মানুষকে দেখতে পেয়ে ভালোই লেগেছিল। জীবনের কিছু স্মৃতি খুবই সুখের। আনন্দে মন ভরে ওঠে এবং আত্মবিশ্বাসে নতুনভাবে পথ চলতে প্রবল বাসনা জাগে।

লেখক : অতিরিক্ত মহাপচিালক (যুগ্ম সচিব) বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড, জনপ্রশাসিন মন্ত্রনালয়।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *