শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

নীরবতা যখন ভাঙলো…

মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন 

হাটতে ক্লান্ত লাগছে। কেন ক্লান্ত লাগছে বুঝতে পারছে না মিহির। মাঝে মাঝে মিহিরের এমন ক্লান্তিভাব আসে। মিহির শুনেছে মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী অবসাদগ্রস্ততা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে মিহিরের আজকের এই ক্লান্তিভাবের কারণ মোটেই তা নয়। গতকাল বিকালের ক্লাস শেষে মিলি মিহিরকে বলেছে আমি একটা জরুরি কাজে বাসায় যাচ্ছি। কিন্তু মিলির জরুরি কাজের কিছুই জানা হলো না মিহিরের। একবার মিহির চেয়েছিল ফোন করে জেনে নিতে কিন্তু সাহস করেনি, পাছে মিলি আবার কী মনে করে। মেয়েদের অনেক ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকে যা অন্যদের সাথে শেয়ার করার মত নয়। অন্যদিনগুলোতে ক্লাস শেষে বিকালে কিছু সময় গল্পগুজব করে কাটিয়ে তারপর বাসায় যায় মিলি। আর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে মিহির চলে যায় তার আবাসিক হলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম ক্লাসেই মিলির সাথে মিহিরের পরিচয়। সেদিন পাশাপাশি সিটে বসেছিল তারা। তারপর থেকে মিলিকে প্রতিদিন কুশলাদি জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারে না মিহির। মিলি কখনও অন্যমনষ্কভাবে কখনওবা হালকাভাবে মিহিরের কুশলের জবাব দেয়। ডিপার্টমেন্টের যেকোন খবর মিলিকে সবার আগে জানায় মিহির। মিলিকে না জানানোটা অপরাধ মনে হয় তার কাছে। কখনও কোন নোট ফটোকপি করলে মিলির জন্য এক কপি করতে ভুল করে না সে। মিলি কিন্তু মিহিরের জন্য এমনটি কখনও করে না। উদাসীনতার সহিত নোট গ্রহণ করে। তবে মিহিরের নোট কখনও ফিরিয়েও দেয় না সে। কোন ব্যাপারে মিলি উপযাচক হয়ে মিহিরের কাছে সাহায্য চেয়েছে এমন ঘটনা নেই। মিহির নিজে থেকেই বুঝতে পারে মিলির কী প্রয়োজন।

মিহির নিজের আচরণে নিজেই অবাক হয়। নিজের অজান্তেই মিলিকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। কখনও মেয়েদের প্রতি এমন দুর্বল ছিল না মিহির। লজ্জায় মেয়েদের কাছ থেকে সে সব সময়ই দূরে থেকেছে। মিলির নীরবতা সত্ত্বেও দিনে অন্তত একবার দেখা না হলে একটি কথা বিনিময় না হলে মিহির অস্থির হয়ে যায়। অথচ মিহির কেমন আছে তা একটিবারও জিজ্ঞেস করে না মিলি। গত ভালবাসা দিবসে মিহিরের ইচ্ছা হয়েছিল অন্যদের মত সে মিলিকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে কিন্তু প্রস্তাবটা দেয়ার সাহস করেনি মিহির। এমনকি সেদিন শুক্রবার থাকায় মিলি ক্যাম্পাসেই আসেনি। মিহিরের সাথে দেখাও হয়নি।

মিহির মিলির চেয়ে তুলনামুলকভাবে মেধাবী। অনার্স অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট দিয়ে মিহির বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। মিহির প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছে। মিহির বিসিএসের ফলাফলের খবরটা সর্বপ্রথম মিলিকেই মোবাইলে জানিয়েছে। মিলি এটাকে অন্যান্য সাধারণ খবরের মতই মনে করেছে। নিয়োগপত্র পেয়ে গেছে মিহির। ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হবে মনে হলেই মিহিরের বুকটা হাহাকার করে উঠছে। ভাল একটা চাকুরি নিয়ে চলে যাচ্ছে সেটা মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। মিহিরের কষ্ট সে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষাটা দিয়ে যেতে পারছে না। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার আরও একমাস বাকি। যথাসময়ে ক্লাস শুরু হলে এতদিনে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত। ক্লাস বিলম্বে শুরু হওয়ায় মিহিরের বড় একটা লাভও হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সে সময়টা ভালভাবে কাজে লাগিয়েছে।

হল ছেড়ে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মিহির। ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পূর্বে মিহির ডিপার্টমেন্টে সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে আসে। যথারীতি সবার কাছ থেকে বিদায়ও নেয়। মিলির সাথে মিহিরের বারান্দায় দেখা। আসি মিলি, ভালো থেকো, বলে মিহির চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। মিলির চাহনি তাকে আচমকা থামিয়ে দেয়। মিলি অপলক মিহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিহির দেখতে পায় মিলির ঠোঁট কাঁপছে, চোখ অশ্রুপূর্ণ, মিহিরের চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছে না। কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরুচ্ছে না। বিগত ছয় বছরের ক্যাম্পাস জীবনে মিহির মিলির এমন চাহনি কখনও দেখেনি। মিহিরের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, চোখ আ‍র্দ্র হয়ে আসছে, কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছে, হৃদয় ভেঙ্গেচুড়ে যেন খানখান হয়ে যাচেছ, ঝড়ো বাতাসের আচমকা টান যেন সবকিছুকে উলটপালট করে দিচ্ছে, শরীর অবশ হয়ে যেন স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলছে। মিহির নিজের স্বাভাবিতা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। মিলি দ্রুতপদে বাথরুমের দিকে চলে গেল। মিহিরের যেন পা চলছে না। বার বার পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। মিলি বাথরুমে ঢুকে সবার অগোচরে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করল। বাথরুম থেকে বের হয়ে সোজা বাসায় চলে গেল। সেদিন সে আর ক্লাসে ফিরে গেল না।

মিলি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, কেন আমি কান্না-কাটি করছি? কেন আমার হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে? সবকিছু কেন ঝাঁপসা লাগছে? আমার কেন অস্থির লাগছে? আমি কি মিহিরকে ভালবেসেছি? আমি তো তাকে ভালবাসিনি। তবে কেন আমার এমন লাগছে? বাসায় পৌঁছে বালিশে মুখগোঁজে মিলি কাঁদতে লাগলো। মিলি কিছুই ভাবতে পারছে না এ মুহূর্তে তার কী করা উচিত। মিহিরের মোবাইল নম্বরটাও মিলি সেভ করে রাখেনি। রাখার প্রয়োজনও মনে হয়নি তার কাছে। মিলির প্রয়োজনে কাকতালীয়ভাবে মিহিরই ফোন করেছে।

সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসতেই মিলির চোখে পড়লো মিহিরের হাতের লেখা নোটের উপর। বুকের ভিতর ধক করে উঠল মিলির। মিলির পূরো নাম আসলে শর্মিলি, মিহির সংক্ষেপ করে মিলি ডাকত। মিলি তাতে আপত্তি করতো না। যখনই মিলির মাথায় আসলো আগামীকাল তাকে মিহির জিজ্ঞেস করবে না মিলি, কেমন আছ? তখনই সে জ্ঞান হারাল।

লেখক : উপসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *