শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

বঙ্গবন্ধুর চীন ভ্রমণস্মৃতি

. এম আবদুল আলীম

[আমার দেখা নয়াচীন। লেখক : শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকাশক : বাংলা একাডেমি। ফেব্রুয়ারি ২০২০। মূল্য : ৪০০]

ভ্রমণকাহিনি সাহিত্যইতিহাসকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। মার্কোপলা, ইবনে বতুতাসহ অগণিত ভ্রমণপিয়াসী মানুষ কালে কালে পৃথিবীর নানা দেশ ভ্রমণ করে লিখেছেন বিচিত্র ভ্রমণকাহিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ এবং দেশের বাইরের নানা স্থান ভ্রমণ করে স্বীয় অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন এবং লিখে গেছেন অনবদ্য ভ্রমণকাহিনি। তারঅসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা পাতায় পাতায় রয়েছে বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ভ্রমণের শৈল্পিক বিবরণ; আছে পশ্চিম পকিস্তান, ভারত, চীন এবং বার্মা ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার স্মৃতিও। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার উদ্যোগে সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুরআমার দেখা নয়াচীনগ্রন্থ বাংলা ভ্রমণকাহিনিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি স্মৃতির সম্মিলনে গ্রন্থ লাভ করেছে আকরগ্রন্থের মর্যাদা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে রাজবন্দি থাকাকালে তিনি চীনভ্রমণের সেই স্মৃতি নিয়ে রচনা করেনআমার দেখা নয়াচীননামক ভ্রমণকাহিনি। বহু ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে সেটি পাঠকের হাতে এসেছে। যেন ভ্রমণস্মৃতি নয়, শিল্পীর নিপুণ তুলির আঁচড়ে আঁকা নয়াচীনের শাসনব্যবস্থা জীবনরূপের বাস্তব আলেখ্য। এতে রেঙ্গুন, হংকং চীনের পরিবেশপারিপার্শ্বিকতা, সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনের নানাকিছু স্থান পেলেও একজন তরুণ রাজনীতিবিদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার যে স্ফুরণ ঘটেছে, তা তাকে পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। গ্রন্থের পাতায় পাতায় রয়েছে একজন উদীয়মান রাজনীতিবিদের চিন্তার স্বকীয়তা, স্বাজাত্যবোধ দূরদৃষ্টির ছাপ। নান্দনিকতা, গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং অপার বিস্ময়ে জগতকে দেখার গুণে গ্রন্থটি লাভ করেছে শৈল্পিক পরিমিতি। কী অসাধারণ কাব্যিকতাপূর্ণ তার গদ্য! বর্ণনা দেখলেই তা উপলব্ধি করা যায় : ‘আমি বাহিরের দিকে চেয়ে দেশটাকে ভালো করে দেখতে লাগলাম। মনে হলো তো আমার পূর্ব বাংলার মতো সকল কিছু। সবুজ ধানের ক্ষেত, চারদিকে বড় বড় গাছ। মাঝে মাঝে মাটির ঘরের গ্রাম, ছোট ছোট নদী, ট্রেনটি পার হয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার কোদাল দিয়ে জমি ঠিক করছে। বেশ লাগছে দেশটা।কাব্যধর্মী গদ্য পড়তে গিয়ে পাঠকের এতটুকু ক্লান্তি আসে না, বরং বিস্ময় কৌতহলে মন ভরে ওঠে।
গ্রন্থটি শুরু হয়েছে তরুণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমানের বায়ান্নর কারামুক্তির স্মৃতি দিয়ে; যেখানে থাকাকালে মওলানা ভাসানী তাকে বারবার বলেছেন : ‘যদি সুযোগ পাও একবার চীন দেশে যাও। সুযোগ তিনি অল্পদিনের মধ্যেই পেয়ে যান এবং আতাউর রহমান খান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রমুখের সঙ্গে রওয়ানা হন নয়াচীনের উদ্দেশে। যাত্রাপথে অর্জন করেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা; যার নিখুঁত বর্ণনা আছেআমার দেখা নয়াচীনগ্রন্থে। কখনও রসালো ভাষায়, আবার কখনও গভীর পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন সেই ভ্রমণস্মৃতি। হংকংয়ে আতাউর রহমান খানকে জনৈক মহিলার প্রেম নিবেদনের বর্ণনায় শেখ মুজিব একদিকে যেমন রসের স্ফুরণ ঘটিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি প্রকাশ ঘটেছে তার সমাজবীক্ষা গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তির। তাছাড়া যাত্রাপথে কী দেখলেন, চীনে গিয়ে কোথায় থাকলেন, কী খেলেন, কী পরলেন, শান্তি সম্মেলনে কোন দেশের প্রতিনিধি কী বক্তৃতা করল, চীনের রাজনীতিশিল্পঅর্থনীতি ধর্ম জীবনব্যবস্থার কী চিত্র দেখলেন; সবকিছুর বর্ণনাই আছে গ্রন্থে। তিনি যে একজন খাঁটি বাঙালি ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় চীন সম্মেলনে প্রদত্ত বাংলা ভাষায় বক্তৃতার মাধ্যমে; যার বিবরণে তিনি লিখেছেন : ‘আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, … বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে।আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা।মাছেভাতে বাঙালির চিরায়ত যে পরিচয় তা তিনি কীভাবে ধারণ করতেন, তা জানা যায় চীনে দেখা হওয়া তার পুরনো বন্ধু মাহবুব তার স্ত্রীর নিমন্ত্রণ গ্রহণে শর্ত প্রদানের ক্ষেত্রে। যার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এভাবে : ‘আমি ওর স্ত্রীকে বললাম, আপনি যদি ঝাল দিয়া মাছ পাক করে খাওয়ান তবে এক্ষুণি আপনার বাসায় যাবো।নদীমাতৃক বাংলার দুরন্ত সন্তান হিসেবে পাকা মাঝির মতো দাঁড় টেনে নৌকা চালিয়ে কীভাবে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তার বর্ণনাও রয়েছে গ্রন্থে। ভ্রমণস্মৃতির আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো বঙ্গবন্ধুর নিখাদ দেশপ্রেম। নানা সমস্যায় জর্জরিত এবং পাকিস্তানিদের দ্বারা নানাভাবে শোষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের দেশের যাতে সম্মানহানি না ঘটে সেজন্য তিনি বিদেশের মাটিতে গিয়ে সেসব সমস্যার কথা তুলে ধরতে দ্বিধাবোধ করেছেন। সে প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘পাকিস্তানের কেহই আমরা নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপার বক্তৃতায় বলি নাই। কারণ মুসলিম লীগ সরকারের আমলে দেশের যে দুরবস্থা হয়েছে তা প্রকাশ করলে দুনিয়ার লোকের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাবো।
চীনভ্রমণে তিনি দেখেছিলেন একটি দেশের নতুনভাবে গড়ে ওঠার চিত্র। নয়াচীন ঘুরে এসে তিনি বুঝেছিলেন, জাতির আমূল পরিবর্তন না হলে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। ভাঙা দালান যেমন চুনকাম করে লাভ হয় না, তেমনি ভাঙা মূল্যবোধও কথার ফুলঝুরি দিয়ে জোড়া লাগানো যায় না। পুরনো দালান ভেঙে দিয়ে যেমন নতুন দালান গড়তে হয়, তেমনি ঘুণেধরা সমাজ মূল্যবোধের বিনাশ করেই নির্মাণ করতে হয় নতুন সমাজ, মূল্যবোধ, চিন্তা ভাবাদর্শ। নয়াচীনে তিনি তা দেখেছিলেন। গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু নানা বিষয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে তুলে ধরলেও; সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং বাঙালিত্ব। সেই ১৯৫৪ সালে নয়াচীনের মধ্যে তিনি যে অপার সম্ভাবনা দেখেছিলেন, আজকের উন্নত চীনের মধ্যে তার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তিনি লিখেছিলেন : ‘নয়াচীনের উন্নতি দেখে সত্যই আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। যদি দশ বৎসর তারা দেশকে শান্তিপূর্ণভাবে গড়তে পারে তবে দেশের জনসাধারণের কোনো দুঃখদুর্দশা থাকবে না, অশিক্ষা কুসংস্কার মুছে যাবে। এবং দুনিয়ার যে কোনো শক্তির সাথে তারা মোকাবেলা করতে পারবে সকল দিক থেকে, কারণ জাতিকে গড়ে তোলার যে প্রধান শক্তি জনসাধারণের মনোবল তা নয়াচীনের জনগণের মধ্যে আছে।তিনি যে কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন, তা তার ভবিষ্যদ্বাণী এবং আজকের চীনের শানৈঃ শানৈঃ উন্নতি দেখে অনুমিত হয়।
বস্তুত, ‘আমার দেখা নয়াচীনগ্রন্থটি পাঠ করে বলা যায়, এটি কেবল সমাজইতিহাস বা রাজনীতির অনবদ্য দলিল নয়; বাংলা ভ্রমণসাহিত্যেও এটি লাভ করেছে উচ্চ স্থান। বিষয়বিন্যাস, দেশকালসমাজ পারিপার্শ্বিকতার বিবরণ, কাব্যিকতাপূর্ণ প্রাঞ্জল ভাষাশৈলীসবদিক থেকেই গ্রন্থটি অসাধারণত্ব লাভ করেছে। গ্রন্থে রাজনীতিবিদ শেখ মুজিব অপেক্ষা লেখক শেখ মুজিব বড় হয়ে উঠেছে। এমন একটি গ্রন্থ পাঠকের সামনে হাজির করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পালন করেছেন ঐতিহাসিক দায়িত্ব

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *