শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

রম্য গল্প : মফিজ

অফিসে নতুন বস যোগদান করেছেন। আমার নাম শুনে বস চশমাটা নিচে নামিয়ে খালি চোখে ভাল করে আমাকে দেখে নিলেন। আমি তাৎক্ষণিক একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। আমি কি কোন বানান ভুল করলাম? কিন্তু মুখে বলার সময় কি বানান ভুল ধরা যায়? অফিসে লেখালেখির সময় বানান ভুল করি অতিমাত্রায়। এতে বসরা বিরক্ত হয়ে অনেক বকাঝকা করেন। কিন্তু উচ্চারণে কি ভুল করলাম? আমার যতদূর মনে পড়ে আমি সুন্দর করেই বলেছি আমার নাম ‘মোহাম্মদ মফিজুর রহমান’। কিন্তু বস এরকম আচরণ কেন করলেন! তবে এটাও হতে পারে তাঁর ঘনিষ্ঠ কারও নাম ‘মফিজ’। তাছাড়া, আমার নাম শুনেও দ্বিতীয়বার তাকানো অস্বাভাবিক কিছু না। অনেক লোককেই দেখেছি আমার নাম শুনে দ্বিতীয়বার তাকাতে। বলা যায় না, আমার নামের কারণেও হতে পারে । যাই হোক, বসের চাহনির কারণে আমার মাথায় চিন্তার পোকা ঢুকে কুট কুট করে কামড়ানো শুরু করেছে। ঐ চিন্তার পোকাটা যতক্ষণ না মরবে, আমার মাথা ততক্ষণ গরম হয়ে থাকবে এবং চারপাশের সবাই তার উত্তাপ কিছু না কিছু টের পাবেই।
প্রাথমিক পরিচয়ে মনে হলো নতুন বস খুব বকাঝকা করবেন। তিনি প্রথমেই ঘোষণা দিলেন আমি কারও ফাঁকি-ঝুঁকি-গাফিলতি বরদাস্ত করবো না। এতেই বুঝা যায় বসের বকাঝকা করার যথেষ্ট অভ্যাস রয়েছে। কিছু লোকের আজাইরা কিছু অভ্যাস থাকে তারমধ্যে বকঝকা একটি। বকাঝকা করা যাদের অভ্যাস তারা সময়-অসময় ভালমন্দ বাছ-বিচার করেন না। যেমন-আমার একজন টিচার ছিলেন নাম তার গাঙ্গুলী বাবু। বকাঝকা তো করতেনই তারপরও মারধর করার জন্য তাঁর হাতটা নিশপিশ করতো। তিনি আবার মারধর করার ক্ষেত্রে সমতা-নীতি বজায় রাখতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সমতা-নীতি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ক্লাসের সবাইকে মারধর করতেন । সেজন্য-ভাল ছাত্র হলেও তাঁর মার থেকে বাঁচার কোন উপায় ছিলো না। তাঁর ক্লাসে কোন না কোন অছিলায় মার খেতেই হতো। তেমনি যে বস বকঝকা করেন তার মুখ থেকে কারো রক্ষে পাওয়ার উপায় নেই। কোন না কোন অছিলায় তাকে বসের বিষাক্ত বাক্য বাণের শিকার হতেই হবে। তবে বসের বকাঝকা খাওয়ার অভ্যাস আমার খুব কম। কারণ আমি খুব পাংচুয়াল। কাজেকর্মে গাফিলতি করার বদঅভ্যাস আমার নাই। এর আগে আমি দুইটা চাকুরি থেকে বরখাস্ত হয়েছি। কেউ বলতে পারবে না কাজে-ক‍র্মে আমার কোন গাফিলতি ছিলো।
একটা চিঠির ড্রাফ্ট নিয়ে বসের টেবিলে রাখলাম। বস দেখলেন। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, আপনার নাম ‘মফিজ’ না?

-জী স্যার। আমার নাম ‘মফিজ’। পুরা নাম ‘মোহাম্মদ মফিজুর রহমান’।

-‘মফিজ’ নামের লোকগুলোর মাঝে কিছু ‘মফিজিটি’ থাকবেই।

-বুঝলাম না স্যার। ‘মফিজিটি’ কী জিনিস?

-সেজন্যই আপনি ‘মফিজ’। নিয়ে যান। ড্রাফ্ট দেখেছি। কারেকশন করে নিয়ে আসুন।

এবার বুঝলাম ‘মফিজ’ নামের সাথে স্যারের এলার্জি আছে। কিছু কিছু লোকের মফিজ, আব্দুল, আবুল, কুদ্দুস এই সমস্ত নামের প্রতি মারাত্মক এলার্জি। যাদের এলার্জি আছে তারা তো চিকিৎসা করাইলেই পারে। এলার্জির তো চিকিৎসা আছে। আমার কোন এলার্জি নাই। কাজেই আমার এই সমস্ত বিষয় নিয়ে না ভাবাই ভাল। কারেকশন করে বসের কাছে নিয়ে গেলাম। বস দাঁতে কটর-মটর করে বললেন, আপনি একটা ‘ফুল মফিজ’। হয় নাই। আবার করে নিয়ে আসুন। এবার আমি প্রচণ্ডরকম রেগে গেলাম। তবে পুরা রাগটাই চেপে গেলাম যাতে আবার স্যারের চোখে ধরা না পড়ে। এটা আমার তিন নম্বর চাকরি। এখন নতুন চাকরিতে ঢোকার আর বয়স নাই। মা বলে দিয়েছেন অতি সাবধান হতে। এই চাকরি হারালে নতুন কোন চাকরি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। কাজেই, রাগটা মাথা থেকে পাকস্থলীতে পাঠিয়ে দিলাম হজম করার জন্য। কিন্তু বদহজম হলো। রুমের বাইরে চলে আসলাম।
একটা লোক অফিসের সামনের বকুল গাছের চারিদিকে গোলাকার করে বাধাঁনো বসার জায়গায় বসে আরাম করে সিগারেট খাচ্ছে। আমি তার পাশে বসলাম। তাকে বললাম, ভাই সিগারেট খাওয়া শেষ হলে সিগারেটের পাছাটা ফেলে দিবেন না। আমাকে দিবেন। লোকটা লাল লাল চোখে আমার দিকে তাকালেন।

-কেন? আপনাকে দিব কেন?

-আমি একটু খাব। কোন দিন সিগারেট খাইনি। ভাবছি আজ একটু খাব।

-কেন? আজ কেন খাবেন?

-মেজাজটা ভাই গরম। তাই।

-আমারওতো মেজাজ গরম। কোনদিন সিগারেট খাইনি। মেজাজটা গরম হয়ে গেলো। তাই একটা সিগারেট কিনে খাচ্ছি। দেখছেন না, ধোঁয়া আকাশের দিকে যাচ্ছে না। সব যাচ্ছে পেঁটে। খাওয়া মানে খাওয়াই। পান-টান করা না। আচ্ছা বলুনতো, ‘আইয়ুব খান’ নামটা কি খারাপ?

-না। খুবই ভাল নাম। নবীর নামে নাম। তবে একটু সমস্যা আছে। নামটার মধ্যে একটু পাকিস্তানী-পাকিস্তানী গন্ধ আছে। রাজাকার-রাজাকার গন্ধও বলা যায়।
সেটার জন্য আমি কী করবো? আমার নাম কি আমি রেখেছি? আচ্ছা, আপনার নামটা জানি কি?

-‘মফিজ’। ‘মোহাম্মদ মফিজুর রহমান’।

-এই ‘মফিজ’ নামের সাথে একটা হাবাগোবা-হাবাগোবা গন্ধ আছে। তাতে আপনার কি কিছু করার আছে? কিচ্ছু করার নাই। কারণ আপনার নাম আপনি রাখেন নাই।

-বুঝলাম, ‘আইয়ুব খান’ নামেও তাহলে কারও কারও এলার্জি আছে। ভাই আপনার নাম নিয়ে কী সমস্যা হয়েছে? বলা যাবে কি?

-আরে ভাই নতুন বস এসেছে। কলিগরা স্যারের কানে লাগিয়েছে আমার নাম ‘আইয়ুব খান’। আমার বাবার সাথে নাকি রাজাকারদের ভাল সম্প‍র্ক ছিলো। রাজাকাররাই আমার নাম ‘আইয়ুব খান’ রেখেছেন। স্যার তো ভেবেছেন রাজাকার পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের মধুর সম্পর্ক রয়েছে। নইলে আমার নাম কেন ‘আইয়ুব খান’ হবে। ‘স্বাধীনতা’ টাইপ করতে ভুল হয়েছিলো। সেজন্য স্যার বাঁকা চোখে বললেন, আপনার নাম তো আবার ‘আইয়ুব খান’। ইঙ্গিতটা আমি বুঝতে পারলাম। মেজাজটা তখনই খারাপ হয়ে গেল।

-কলিগরা না বললেও তো আপনার স্যার আপনার নাম জেনে যেতেন, তাই না? আচ্ছা ভাই, আপনি কখন বুঝতে পেরেছেন যে আপনার নাম ‘আইয়ুব খান’?

-এসএসসি পাশ করে যখন কলেজে ভর্তি হয়েছি তখনই বুঝতে পেরেছি আমার নাম ‘আইয়ুব খান’।

-নাম তো সংশোধন করা যায়। আপনি সংশোধন করিয়ে নিতে পারতেন।

-আরে ভাই সেটা কি এত সহজ কাজ।

-আপনার মনে তো ভাই আপনার নাম নিয়ে অনেক দুঃখ। আর আমার মনেও ‘মফিজ’ নাম নিয়ে অনেক কষ্ট।

-তাহলে তো বেশ হলো—আমি দুঃখ আর আপনি হলেন কষ্ট, দু’জনে মিলে হয়ে গেলাম দুঃখ-কষ্ট।

ভদ্রলোক সিগারেটের পাছাটা আমার হাতে দিয়ে হুট করে উঠে চলে গেলেন। আমি একটু আয়েশ করে সিগারেটের পাছায় টান মেরে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়লাম।

-২-

রাতে খাওয়ার পর বাবা-মা একসাথে বসে টিভিতে নাটক দেখছেন। তারা খুব হাসছেন। হাসতে হাসতে মার মুখ থেকে পানের পিছকারির কিছু অংশ মেঝেতে পড়ে গেল। আমি কাছে যেতেই মা বললেন, মফিজ বসই। টিভিতে হাসির নাটক হইতেছে। তাই হাসতাছি। জাহিদ হাসান অভিনয় করছে। তুই কিছু ক’বি নাকি?

-মা, বলছিলাম কি, দুনিয়াতে এত নাম থাকতে তোমরা আমার নামটা ‘মফিজ’ ক্যান রাখলা? এই নাম নিয়ে অফিস-আদালতে রাস্তা-ঘাটে হাসাহাসি হয়। মানুষ নাম জিজ্ঞেস করলে বুক ফুলিয়ে বলা যায় না।

-ও রে বাবা! কী বলিস এটা! ‘মফিজ’ নামটা তো খুবই ভালো। মৌলানা সাব তোর নাম রাইখ্যা দিছে। নামের অর্থ খুবই ভালো। ঐ যে দেখ তোর নামে নাটক বানাইছে। নাটকের নাম ‘মফিজ’। খুব হাসির নাটক। তোর নামে তো নাটক-সিনেমা হইছে। তাছাড়া বই পুস্তকে পড়স নাই— নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে বড় করে তোলে।

-তুমি কী জানো আমার চাকরি পাইতে কেন এত দেরি হইছে? এই ‘মফিজ’ নামের কারণে। আমি ভাইভা পরীক্ষায় যখন বলি আমার নাম ‘মফিজ’ তখন যারা ইন্টারভিউ নিতে বসে তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। মুছকি-মুছকি হাসে। কত ভালো প্রিপারেশন আমার । ‘মফিজ’ নামের কারণে আমার ভালো কোন চাকরিই হইলো না।

-কে বললো তোর চাকরি হয়না? তোর তো এটা তিন নম্বর চাকরি।
এই ‘মফিজ’ নামের কারণেই আমার চাকরিগুলো গ্যাছে মা। যখন বসরা শুনে আমার নাম ‘মফিজ’ তখন তারা মনে করে আমি একটা গাধা। আমি কিচ্ছু জানি না। আমার উপর তারা কোন আস্থা রাখতে পারে না। আমার চেয়ে কত খারাপ খারাপ ছাত্র অফিসার হয়ে গেলো। আর আমি কেরাণীই থেকে গেলাম। পোড়া কপাল আমার।

-তুই হুদাই-হুদাই কষ্ট পাইতেছিস। এগুলো তোর নামের কারণে হয় নাই।
অবশ্যই নামের কারণে হইছে। ‘মফিজ’ নামের কারণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কোন প্রেম হয় নাই। মেয়েরা আমার নাম শুনে মুখ টিপে-টিপে হাসতো। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতো। আমার তো মনে হয় বিয়েটাও শেষ পয‍র্ন্ত হবে না। কোন স্মার্ট মেয়ে কি চাইবে তার স্বামীর নাম ‘মফিজ’ হোক? আমার অফিসে রুবি নামে নতুন কলিগ জয়েন করেছে। দেখতে নিগ্রোদের মতো কালো। দাঁতগুলো পান খেয়ে তেতুঁলের বীচির মতো বানিয়ে রেখেছে। সেও আমার নাম শুনে মুছকি হাসে। তোমরা আমার নামটা ‘মফিজ’ রেখে ভালো কর নাই। আমাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছাে। সমাজে আমি মুখ দেখাতে পারি না। যেখানে সেখানে আমার প্রেসটিজ পাংচার হয়ে যাচ্ছে।

ছেলের কথার সাথে মফিজের বাবা কছিম মণ্ডলও একমত। তিনি বললেন, আমি নিষেধ করেছিলাম। এই নাম রাখা যাবেনা। এই নাম নিয়ে হাসি-তামাশা হয়। বোকা কিসিমের লোকদেরকে ‘মফিজ’ বলে টিটকারি করা হয়। তোর মা আমার কথা শুনলোই না। তোর মা বললো, এটা মৌলানা সাব রাখছে। খুব ইসলামাী নাম। ছেলের খুব মঙ্গল হবে।

আমার ভাগনীর নাম রাখার সময় ‘সোনামনিদের সুন্দর নাম’ নামে একটা বই কিনেছিলাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার নামের অর্থ তন্ন-তন্ন করে খোঁজলাম সেই বইয়ে। পেলাম না। পাব কীভাবে? কোন লেখক কি মনে করতে পারে ‘মফিজ’ কোন সোনামনির নাম হতে পারে? গুগলে সার্চ দিলাম। ‘মফিজ’ নামের অর্থ পাওয়া গেল ‘টু গিভার’। নামের অ‍র্থ তো ভালই। কিন্তু মিছামিছি লোকজন খারাপ বলে কেন? তাহলে কি এই নামে এমন কোন ব্যক্তি ছিলো যে কিনা মীর জাফর বা সীমারের মতো। যার কারণে ‘মফিজ’ নামটার এই অবস্থা। উত্তরবঙ্গের লোকজনকে জিজ্ঞেস করবো। তারা নিশ্চয় জানে। কারণ তাদেরকে তো অন্যবঙ্গের লোকেরা ‘মফিজ’ বলে ডাকে। শুনেছিলাম উত্তরবঙ্গ থেকে যারা বাসে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কম ভাড়ায় ঢাকা চলে আসে তাদেরকে ‘মফিজ’ বলে। কিন্তু দাড়িয়ে তো অন্য এলাকার লোকও আসে। তাহলে উত্তরবঙ্গের লোকেরা কী দোষ করলো? আমার স্যারকে জিজ্ঞেস করা যায়। কারণ স্যারের ‘মফিজ’ নামের প্রতি মারাত্মক এলার্জি আছে। কিন্তু সাহস হচ্ছে না। আবার যদি ঝাড়ি-টাড়ি মারে।

-৩-

অফিসের সামনে দুঃখ ভাইয়ের সাথে দেখা। হন হন করে বুক ফুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

-দুঃখ ভাই, একটু দাড়ান। রাজাকারের বাচ্চার একটা কঠিন দুর্নাম কান্দে নিয়ে এভাবে বুক ফুলিয়ে হাটেন ক্যামনে?

-আরে ভাই, সবাইকে কি সেটা বুঝতে দিয়েছি নাকি।

-কী করেছেন দুঃখ ভাই? একটু খোলাসা করে বলেন।

-আমি আমার নামটাকে স্মার্ট করে নিয়েছি। আমার পুরা নাম ‘মোহাম্মদ আইয়ুব খান’। আমি সংক্ষেপে লেখি এম. এ. খান। অনেক স্মার্ট না? লোকজন তো টেরই পায় না। আমার কলিগরা শুধু প্যাঁচ লাগায়।

-আপনি তো দেখি অনেক চালাক। শেয়াল মামা ফেল। এজন্যই তো দেখি অনেকে তাদের নামের সাথে এ, বি, সি, এস, এফ, এম ইত্যাদি ইংরেজি ব‍র্ণ লেখে। নিশ্চয় তারাও চালাকি করে।

-আপনি একটা জেনুইন মফিজ। আপনার নামটাকে স্মার্ট করে নিতে পারতেন না? এম. এম.রহমান হলে কত স্মার্ট হতো নামটা।

-ঠিক বলেছেন দুঃখ ভাই। আমি আপনার কাছে ঋ‍ণী। সেদিন সিগারেটের পাছাটা দিয়েছিলেন মনের কষ্টে একটা সুখটান দিয়েছিলাম। আজ লাঞ্চের সময় বকুল গাছতলায় একটু আসবেন। আপনাকে সিগারেটের পাছা খাওয়াবো।

স্যার সালাম দিয়েছেন। দুরু দুরু বুকে হাজির হলাম। না জানি কী বকা খেতে হয়। স্যারের রুমে আবার আজিজ সাহেবও আছেন। লোকটা খুবই বজ্জাত। অফিসের সবার দুর্নাম করে বেড়ানো তার নেশা। সালাম দিয়ে সাহস করে দাড়িয়ে রইলাম।

-এই যে মফিজ সাহেব, শুনেন সমাজে চলতে গেলে একটু বুদ্ধি-সুদ্ধি খাটাতে হয়। স্মার্ট হতে হয়।

-জী স্যার। সঠিক স্যার।

-আমার এক বন্ধুর নাম আব্দুল কুদ্দুস খান। ভালো ফুটবল খেলতো। সে একদিন কলেজের মাঠে গোমড়ামুখে বসে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? মন খারাপ কেন? সে বললো, গতকাল কলেজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে যে নাটকটা মঞ্চস্থ হয়েছে সেখানে আব্দুল কুদ্দুস নামে একটি চরিত্র আছে। সেই কুদ্দুস খুবই হাবাগোবা। সব সময় বীচি কলা খায়। সেজন্য নাটকে সে ‘কলা কুদ্দুস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ক্লাসে সবাই আমাকেও ‘কলা কুদ্দুস’ নামে ডাকা শুরু করেছে। ক্লাসে তো বসাই দুষ্কর হয়ে গেছে। কী করবো? ‘কুদ্দুস’ নাম নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তো আমার পিছু ছাড়ছে না। কী করা যায়? বুদ্ধি দে। আমি তাকে বুদ্ধি দিলাম, তোর নামের আব্দুলকে ‘এ‘ এবং কুদ্দুসকে ‘কে’ বানিয়ে এ. কে. খান করে দে। তাহলে একটা বনেদি ভাব চলে আসবে। নামটা অনেক স্মার্ট শোনাবে। আমার বুদ্ধি সে গ্রহণ করলো। এখন সে বিখ্যাত ফুটবলার এ. কে. খান।

আরেকজনের কথা বলি। আমি যখন জেলায় চাকরি করি তখন এম. আর. খান নামে একজন অফিসার ছিলেন। খুবই ধুরন্ধর স্বভাবের। বিভিন্ন আকাম করতো কিন্তু ধরা যেতো না। বাইন মাছের মতো পিছলে যেতো। তাকে কোন নিয়োগ পরীক্ষার সদস্য বানালে প্রশ্ন ফাঁস করে দিয়ে টাকা খাইতো। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পেতো না এম. আর. খান প্রশ্ন আউট করেছে। সে কমিটিতে না থাকলে অন্য ফন্দি করতো। আবেদনপত্রে পরীক্ষার্থীদের রেজাল্ট দেখে আন্দাজ করে নিতো কে পরীক্ষায় ভাল করতে পারে। সেরকম কয়েকজনের সাথে গোপনে কনট্রাক্ট করে ফেলতো। এবার যে-ই প্রশ্ন করুক না কেন তার কনট্রাক্ট করা আবেদনকারীরাই ভাল করতো। তার কিছুই করতে হতো না । মাঝখান থেকে সে টাকাটা পেয়ে যেতো।
-বলতে পারবেন তার নামের ‘এম. আর.’ এর পূর্ণরূপ কী?

-বলতে পারবো না স্যার।

-‘এম. আর.’ হলো মফিজুর রহমান। তার পুরো নাম মফিজুর রহমান খান।

-বলেন কি স্যার! ‘মফিজ’ নামের লোক এত চালাক হতে পারে!

-আপনার নামটা খুব সহজেই ‘এম. এম. রহমান’ করা যেতো। ‘এম. এম.’ হলো ‘মোহাম্মদ মফিজুর’। যদি আপনি সেটা করতেন তাহলে খুবই বুদ্ধিমানের কাজ হতো। ‘এম. এম. রহমান’ হলে নামটা খুবই স্মার্ট এবং বনেদি হতো। আপনি সমাজে বুক ফুলিয়ে আপনার নাম বলতে পারতেন। এখন কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে আপনার বলতে আধা মিনিট বিলম্ব হয়, তাই না?

-জী স্যার। খুবই বোকামি হয়ে গেছে স্যার। এখন চেন্জ করা যাবে না স্যার?

-এখনো করা যাবে। কোন সমস্যা নাই। শুনেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। বন্ধুর বাবা হাইকোর্টের বড় উকিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোন হলে থাকো? আমি বললাম, স্যার এ. এফ. রহমান হলে। তিনি বললেন, তোমরা তো আবুল হলে থাকো। তোমরা নিজেরা আবার আবুল হয়ে যেওনা। আমি বললাম, আংকেল আপনার কথা তো বুঝলাম না। তিনি বললেন, ‘এ. এফ.’ এর পুরো মানে জানো? আমরা তো পুরোটা জানি না। তিনি বললেন, পুরো নামটা হলো। আবুল ফজলুর রহমান। দেখেন, ঐ ভদ্রলোক কত সুন্দরভাবে তার নামের ‘আবুল’ অংশ স্মার্ট করে নিয়েছিলেন।

-আমি কিন্তু পুরোপুরিই ‘মফিজ’। জানেন, কী জন্য?

-বলেন কি স্যার! জানিনা তো। আমার এবং আজিজ সাহেবের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো।

-আমি বিসিএস পরীক্ষায় যদি ফার্স্ট চয়েজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স দিতাম তাহলে আমি ফরেন অ্যাফেয়ার্স পেয়ে যেতাম। কারণ আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমাদের জন্য ৩০% কোটা ছিলো। আমার পোস্টিং হতো একদেশ থেকে অন্যদেশে। অথচ দেখেন, মফিজের মতো ফার্স্ট চয়েজ দিয়ে রেখেছিলাম এই চাকরির। তাই আজ আপনাদের মতো মফিজদের সাথে আমার চাকরি করতে হচ্ছে। আমার নাম কী আপনারা জানেন?

-জানি স্যার।

-কী নাম বলেনতো?

-সি. এম. ইসলাম।

-‘সি. এম.’ এর পূর্ণরূপ জানেন?

-জানিনা স্যার।

-‘চৌধুরী মফিজুল’। আমার পুরো নাম ‘চৌধুরী মফিজুল ইসলাম’। হু হু হা হা হা ।
আমার আর আজিজ সাহেবের মুখ হা হয়ে গেল।

লেখক : মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন -উপসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *