মঙ্গলবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং |

স্মরণ : আতিকুল হক চৌধুরী

আহমেদ মূসা, নিউ ইয়র্ক, ইউএসএ : ১৭ জুন টিভি নাটকের প্রবাদ পুরুষ আতিকুল হক চৌধুরীর সপ্তম মৃত্যু-বার্ষিকী। ২০১৩ সালের এই দিনে তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। ষাটের দশকের গোড়ায় প্রথমে বেতার ও পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগদান করেন আতিকুল হক চৌধুরী। ষাটের দশকে বেতারে তার প্রযোজিত নাটকের সংখ্যা শতাধিক। আমার প্রথম টিভি নাটকের এই প্রযোজকের কাছে আমি বিশেষভাবে ঋণী। তাঁকে নিয়ে আমার স্মৃতি কথার অংশ-বিশেষ এখানে তুলে ধরলাম:
“১৯৮৯ সালের মধ্যভাগের এক দুপুরে প্রখ্যাত টিভি-ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী তাঁর মুখোমুখি উপবিষ্ট আমাকে বললেন, স্ক্রিপ্ট পছন্দ হয়েছে। নায়কের চরিত্রে শক্তিমান অভিনেতা প্রয়োজন। আপনি কাকে প্রেফার করেন?
আমি জীবনের প্রথম টিভি নাটকের নায়ক নির্বাচনে মতামত দিতে পারবো, এতোটা ভাবিনি। সুযোগ পেয়ে দুরু-দুরু বুকে বললাম, হুমায়ুন ফরীদি হলে ভাল হয়। আতিকুল হক চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বললেন, এক্জাক্টলি। আমিও তাই ভাবছিলাম।
“নাটকের নাম চানমিয়ার নেগেটিভ-পজিটিভ। নায়কের চরিত্র ছিল একজন ছিচঁকে চোরের, যে নানা কারণে চুরি ছেড়ে দিলেও কাউকে তা বিশ্বাস করাতে পারছিল না, “কালো খাতা” থেকে নাম কাটাতে পারছিল না। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা চানমিয়াকে ধরে চরম শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চানমিয়া অনেক বলে-কয়ে জীবন রক্ষা পাওয়ার পর তিনি জীবন দেশের কাজে উৎসর্গের সিদ্ধান্ত নেন। মুক্তিযুদ্ধে বেশ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে চানমিয়া সুখ জীবন ফিরে পাননি। বড় চোরেরা তখন গিলে খাচ্ছে ছোট চোরদের – অর্থাৎ মাৎস্যন্যায়।
নায়ক সম্পর্কে মতামত দিয়ে সেই যে এলাম, নাটক প্রচার পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। অনেকে রিহার্সাল দেখতে যান, এডিটিং দেখতে যান। এই নাটকের ক্ষেত্রে আমার তাও যাওয়া হয়নি। কারণ ছিল দু’টি; এক, স্ক্রিপ্ট তুলে দিয়েছি আতিকুল হক চৌধুরীর হাতে, মূলচরিত্র করবেন ফরীদি, আমি গিয়ে কি করব? দুই, সন্দিহান ছিলাম, নাটক ফ্লপ করে কি না, বেশি লোক হাসিয়ে লাভ কি? নিরবেই চলে যাক।
“পর্দায় নাটক দেখে চমকে উঠলাম। আমি নায়ককে যেভাবে কল্পনা করেছিলাম ফরীদির অভিনয় তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি জীবন-ঘেঁষা ও সপ্রতিভ। বিস্মিত শুধু আমি হইনি, দর্শক-শ্রোতা-নাট্যমোদি সবাই হয়েছেন। তখন বিটিভি-ই ছিল একমাত্র ভরসা। সপ্তাহের নাটক নিয়ে সারা সপ্তাহ আলোচনা হতো। প্রশংসার শেষ ছিল না। বহুবার এ নাটক দেখানো হয়েছে “মনের মুকুর”-এ। এই কৃতিত্ব আমার চেয়ে বেশি হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় ও আতিকুল হক চৌধুরীর নির্মাণ-কৌশলের। … দেখা গেল নাটকের একটি ছিঁচকে চোরের পার্সোনালটি ও পরিব্যাপ্তির কাছে ধূলিস্যাত হয়ে যাচ্ছে বড় বড় সব চরিত্রের ব্যক্তিদের অভিব্যক্তি। চোর ছাপিয়ে গেছে ভদ্রলোকদের।
পরদিন আতিকুল হক চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে দু’টো ভাল খবর পেলাম। এক, চরিত্রটি ফরীদির বেশ পছন্দ হয়েছিল বলে বেশি করে একাত্ম হতে পেরেছেন। দুই. চানমিয়ার নেগেটিভ-পজিটিভ-এর জন্য আতিকুল হক চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তখনকার সময় ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিলে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ, বিটিবি-র ভেতরে তখন অনেক দ্বীপ-উপদ্বীপ।
“আতিকুল হক চৌধুরী বললেন, মুসা, স্ক্রিপ্ট বেশি কাটাকুটির বদনাম আমার আছে, কিন্তু আপনার একটি সংলাপও ফেলিনি। কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে, ইউ আর সান অব দ্য সোয়েল। সংলাপগুলি ছিল খুবই মাটি ও জীবনের কাছাকাছি।
…নাটক প্রচারের প্রায় একযুগ পর দৈনিক বাংলার সিড়িতে উঠতে-উঠতে হঠাৎ দেখা পাওয়া আতিকুল হক চৌধুরী বললেন, কি অপূর্ব নাটক ছিল আপনার? কি অপূর্ব অভিনয় ছিল ফরীদির। কোনো ধ্বংসের মুহূর্তে আমাকে যদি কেউ পাঁচটি নাটক হেফাজতে রাখতে বলেন, তার একটি হবে চান মিয়ার নেগেটিভ-পজিটিভ।”
দোয়া করছি আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেস্ত নসীব করুন ।
আমার প্রকাশিত গ্রন্থ “যেমন দেখেছি ওয়ান ইলেভেন”-এ অন্যান্য নিবন্ধের সঙ্গে সন্নিবেশিত “একটি নাটক ও দুই দিকপাল” স্মৃতিকথার অংশ-বিশেষ।

লেখক-আহমেদ মূসা, সাংবাদিক-নাট্যকার, সাপ্তাহিক বর্ণমালার উপদেষ্টা সম্পাদক।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *