মঙ্গলবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং |

ছোট গল্প : মাটি দিয়ে খেলা

**মোহাম্মদ জালালউদ্দিন **

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বালি দিয়ে খেলার স্মৃতি আবির ভুলতেই পারছে না। চার বছর বয়সী আবির বাবা-মার সাথে গত শীতকালীন ছুটিতে কক্সবাজার গিয়েছিল বেড়াতে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া আবিরের বোন মুনিয়াও সাথে ছিল। টিভিতে নদী বা সমুদ্রের কোন ছবি দেখলেই আবির চেচিয়ে বলে, কক্সবাজার! কক্সবাজার! আমাকে কক্সবাজার নিয়ে চল। আমি মাটি দিয়ে খেলব। বালিকে সে বলে মাটি। করোনা ভাইরাসের কারণে গৃহবন্দি আবিরের দাবি আরো জোরালো রূপ ধারণ করল। বাধ্য হয়ে আবিরের মা আসমা বেগম কয়েক কেজি আটা কিনে দিলেন ছেলেকে। আটাগুলো আবির ট্রের ভিতর রেখে মাটি দিয়ে খেলার মত করে খেলে।

আবিরের বাবা আলমাস বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। বেতনাদি যা পায় তা দিয়ে তার চার সদস্যের পরিবার ভালভাবেই চলে যায়। বাবা-মার জন্য কিছু পাঠিয়ে সামান্য কিছু সঞ্চয়ও করতে পারে। করোনা ভাইরাসের কারণে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক কাজ নেই বলে বেশ কিছু কর্মচারী ছাঁটাই করেছেন। আলমাস ছাঁটাই থেকে বেঁচে গেলেও কোম্পানি থেকে বলা হয়েছে বেতন পাবে অর্ধেক। কিন্তু সেটাও তিন মাস ধরে বকেয়া রয়েছে।

আলমাস জমানো টাকা খরচ করে যাচ্ছে। জমানো টাকাগুলো শেষ হয়ে গেলে আলমাস কী করবে ভেবে পায় না। একটা অজানা আশঙ্কা তার ভিতরে ভিতরে কাজ করছে। আসমা আলমাসকে বলেছে- বাসাটা চেন্জ করে একটা কম ভাড়ার বাসা নিতে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ তো তা বলতে পারছে না। ততদিনে জমানো টাকাগুলো যদি শেষ হয়ে যায় তখন কী করবে? কিন্তু আলমাস তা আপাতত চাচ্ছে না। আলমাস মনে করে নিশ্চয়ই এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। সবকিছু আবারও আগের মত চলবে। তাছাড়া এক দশকের বেশি সময় ধরে সে এ বাড়িতে আছে। পাশের ফ্লাটেই বাড়ির মালিক থাকেন। বুড়ো মালিক আর তার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ তাদের সাথে থাকে না। আবির আর মুনিয়া তাদেরকে নানা-নানী ডাকে। তাদেরকে বুড়ো-বুড়ি নাতি-নাত্নীর মতই আদর করেন। তাদের নানা-নানী জীবিত নেই। বাড়ির মালিক বুড়ো-বুড়ি তাদের নানা-নানীর অভাব পূরণ করে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য এ বন্ধন ছিন্ন করা মোটেই উচিত হবে না।

আলমাস আসমাকে বলে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তোমাকে মেয়ের মত দেখেন। ছেলে-মেয়েগুলোকে নিজের নাতির মত যেভাবে আদর করেন তুমি তাঁদেরকে রেখে কীভাবে যাবে? আবির হয়ত জানেই না তাঁরা তার নানা-নানী নন। মুনিয়া যদিও এখন বুঝে। আসমাও যে সেটা ভাবেনি তা নয়। এই পরিস্থিতিতে চলে যাওয়া ভাল দেখায় না। কিন্তু তাদের ভাড়া দেবার সামর্থ্যই যদি না থাকে তখন কী করবে?

চারমাসেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল না। অধিকন্তু আলমাসের পরিবারে হানা দিল সেই অদৃশ্য নৃশংস শ্বাপদ, যার নৃশংসতায় প্রতি শতাব্দীতেই ধরণীর মানুষের জীবন তছনছ হয়েছে। অফিস থেকে ফেরার সময় সামান্য জ্বরভাব ছিল আলমাসের। বাসায় আসার পর খুশখুশ কাশিও শুরু হল। আলমাস ভাবলো, অফিসে যাওয়ার পথে মাথায় বৃষ্টির ফোটা পড়েছিল। হয়তোবা সেকারণেই খুশখুশ হচ্ছে। পরদিন অফিসে গিয়ে জ্বর-কাশি একটু বেশি মনে হওয়ায় হাসপাতালে চলে গেল স্যাম্পল দিতে। পরের দিনই জানতে পারলো তার কোভিড-১৯ পজিটিভ। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই আলমাস শতভাগ সাবধান থাকার চেষ্টা করেছে। তারপরও পজিটিভ রেজাল্ট তার মনকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলল। নিজেকে সাধ্যমত শক্ত রাখার চেষ্টা করল।

************

আলমাস নিজ বাসাতেই চিকিৎ‌সা নিচ্ছে। একটা রুমে আলাদা থাকে আলমাস। আবির বাবার সাথে থাকতে চায়, বাবার কোলে উঠতে চায়, বাবাকে ধরতে চায়। আসমা অতিকষ্টে তাকে আটকিয়ে রাখে। আলমাস তার রুমের দরজা সর্বদা বন্ধ করে রাখে। আবির দরজা খোলার জন্য ধাক্কা-ধাক্কি করে। খুলতে না পেরে কান্না-কাটি করে অস্থির করে তোলে। আলমাসের মন খারাপ হয়। ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে আসমাকে বলে আবিরকে নিয়ে দরজা থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাড়াতে। আসমা আবিরকে শক্ত করে ধরে দাড়িয়ে থাকে, যাতে দৌড় দিয়ে আলমাসের কাছে চলে না যায়। নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে আলমাস আবিরের সাথে কথা বলে।

এক সপ্তাহ কেটে যায়। আলমাসের স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ডাক্তারের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে আসমা সার্বক্ষণিক আলমাসের পাশে থাকে। সময়মত ঔষধ খাওয়ানো, খাবার খাওয়ানো, বাইরে থেকে ঔষধপত্র কিনে আনা ইত্যাদি কাজগুলো তাকে একাই করতে হয়। গ্রাম থেকে কোনও আত্মীয়-স্বজন তাদের দেখতে আসার সাহস পায় না। চরম এ দুঃসময়ে আলমাসের একজন কলিগ এগিয়ে আসে। বাসা থেকে খাবার এনে হাসপাতালে দিয়ে যায়।

ছোট্ট অবোধ দু’টি শিশু বাসায় রয়েছে। তাদের জন্য আসমার মনটা ছটফট করে। কিন্তু আলমাসকে ছেড়ে সে কীভাবে আসবে? কখন তার শরীর খারাপ হয়ে যায়। কখন কী প্রয়োজন পড়ে তা বলা যায় না। এক মুহূর্তের জন্যও হাসপাতাল ছেড়ে আসার কোন উপায় নেই। আবির-মুনিয়া এবং আলমাসের কষ্টে আসমা যেন পাগলপ্রায়। আসমার উপর দিয়ে যেন তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঝড়ো হাওয়ায় সবকিছু যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মালিককে ফোন করে আসমা করজোড়ে অনুরোধ করে আবির-মুনিয়াকে একটু দেখে রাখার জন্য।

আবির-মুনিয়ার খাবারের ব্যবস্থা করে বাড়ির মালিক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাঁরা দরজার কাছে খাবার রেখে যায়। আবির-মুনিয়া সেখান থেকে খাবার নিয়ে খেয়ে নেয়। যদিও আবির-মুনিয়া আক্রান্ত হয়নি, তবে তারা যেহেতু আলমাসের সংস্পর্শে এসেছিল সেহেতু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

আবির বাবা-মাকে ছাড়া জীবনের একটা দিনও অতিবাহিত করেনি। আবির মুনিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমাকে মার কাছে নিয়ে চল। মুনিয়া আবিরের কান্নায় স্থির থাকতে পারে না। সেও কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে দু’জনের হেচকি উঠে যায়। পাশের ফ্লাটের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও অবুঝ শিশু দু’টির বুকফাটা কান্নায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। কখনো দরজা খুলে দূর থেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। আবির কাঁদতে কাঁদতে নানা-নানা বলে ছুটে যায় কিন্তু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দরজা বন্ধ করে দেন। ঘরে ঢুকতে দেন না। মুনিয়া তাকে ঘরে ফিরে আসতে বলে। কিন্তু সে ঘরে ঢুকতে চায় না। মুনিয়া তাকে টেনে-হিচড়ে ঘরে এনে দরজা বন্ধ করে দেয়।

আলমাসের তীব্র কষ্ট আসমাকেও ছুঁয়ে যায়। বিক্ষিপ্ত চিত্তেও সে আলমাসকে সাহস জোগায় মনোবল শক্ত রাখার জন্য। কিন্তু আলমাস আবোল-তাবোল কথা বলা শুরু করে। স্বপ্নে নাকি তার দাদা-দাদীর সাথে দেখা হয়েছে। তাঁরা নাকি তাকে ডাকছেন। আলমাস মারা গেলে আসমার কী কী করা উচিত- এই সমস্ত কথা বলার চেষ্টা করছে। একবার বলছে, শোন আসমা, তুমি কিন্তু লেখাপড়া বন্ধ করে কাজটা ভাল করনি। এই যে দেখ, আমি যদি এখন মারা যাই তাহলে তুমি একটা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে। আসমা আলমাসকে ধমকের স্বরে বলে, তুমি চুপ করে রেস্ট নাও। ঐ সমস্ত অলক্ষুনে কথা কখনও বলবে না। পরক্ষণেই আসমার মনে অজানা আশঙ্কা ভর করে-সত্যিই যদি আলমাস মারা যায়! চারপাশে প্রতিদিন কত লোকই তো মারা যাচ্ছে। হেয়ালী করেই পড়ালেখাটা সে বাদ দিয়েছে। অথচ আলমাস কতবার বলেছে, পড়ালেখা বন্ধ করোনা, বন্ধ করোনা। এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র চার মাস আগে বিয়ে হয়। ইচ্ছা করলেই সে এইচএসসি পরীক্ষাটা দিতে পারত। বিয়ের পরও কত মেয়ে পড়ালেখা করে অফিসার হয়ে যাচ্চে। সেও নিশ্চয় পারত। নিজের দোষেই তার পড়ালেখাটা বন্ধ হয়েছে।

আলমাস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলতে থাকে, তুমি এইচএসসি পাশ থাকলেও আমাদের কোম্পানিতে একটা চাকরি দাবি করতে পারতে। এখন সেটাও পারবে না। এবার আসমা আলমাসকে বাঁধা দিচ্ছে না। নীরবে শুনছে। আমি না থাকলে তোমাকে তোমার বাবার বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। তোমার বাবা-মা নেই। ভাই-ভাবীর সাথে তোমার থাকতে ভাল লাগবে না। আমার ভিটে-মাটি আছে। কিছু জমি-জমাও আছে। আমার ভিটে-বাড়িতেই ছেলে-মেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করো। তুমি সেখানে সম্মানের সাথেই থাকতে পারবে। একটা সেলাই মেশিন কিনে নিও। সেলাই কাজ শেখার জন্য গ্রামে লোক পাবে। তাদের কাছ থেকে শিখে নিও। ছেলে-মেয়ে দুটির পড়ালেখা কখনো বন্ধ করবে না।

সাতদিন চলে যায়। আলমাসের অবস্থার উন্নতি হয় না। অষ্টম দিনে রাত চারটার দিকে আলমাসের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আসমা পাগলের মত ছুটতে থাকে ডাক্তার-নার্সের খোঁজে। কিন্তু ঐসময় সবাই কর্মক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। আসমার আর্ত চিৎকারে বিশ্রাম ছেড়ে ছুটে আসে নার্স । কিন্তু ততক্ষণে আলমাসের শ্বাস-প্রশ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আসমা সেন্সলেস হয়ে যায়। আসমার সেন্স যখন ফিরে আসে তখন কেউ একজন জিজ্ঞেস করে লাশ কোথায় কবর দেয়া হবে? লাশ নিবে কে? আসমার মাথায় কিছু আসে না। আলমাস অনেক কিছুই বলেছে কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে আসমার সাথে কোন কথা বলেনি। সে শুধু এইটুকু বলে, লাশ নেয়ার মত তার কাছে কোন টাকা-পয়সা অবশিষ্ট নেই। গ্রাম থেকে লাশ নেয়ার জন্য কারো আসারও কোন সম্ভাবনা নেই।

আলমাসের কলিগ একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে আলমাসের গ্রামের ঠিকানা দেয়। নয়ানপুর, শেরপুর সদর। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের লোকজন আলমাসের লাশ নয়ানপুর গ্রামে দাফন করে আসে। যদিও আলমাসকে দাফন করতে গ্রামের লোকজন প্রচণ্ড বাঁধার সৃষ্টি করে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত দাফন করতে সমর্থ হয়।

আসমা চরম অনিশ্চয়তা আর বুকভরা কষ্ট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরে আসে। আবির-মুনিয়াকে জড়িয়ে ধরে মেঝে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না শুরু করে। মুনিয়া বুঝতে পারে। সেও মায়ের সাথে কাঁদতে থাকে। আবির বুঝতে পারে না। সেও কাঁদে। তার কান্না আনন্দের। এক সপ্তাহ পর মাকে কাছে পাওয়ার আনন্দের কান্না। আবির মাকে, জিজ্ঞেস করে তুমি একা কেন? বাবা কোথায়? বাবা কখন আসবে? আসমা নিরুত্তর।

আসমা ঘরের মেঝ থেকে উঠছে না। খাওয়া-দাওয়া করছে না। বুড়ো-বুড়ি আসমার কান্নায় নিজের মেয়ের মতই কষ্ট পাচ্ছে। তাদের অশ্রুধারাও থামছে না। বাড়ির মালিকের ছেলে-মেয়েরাও আলমাসের মৃত্যুতে চরমভাবে ব্যথিত। তারা বাবা-মার সাথে থাকতে পারে না। এতদিন আলমাস থাকায় বুড়ো-বুড়ির জন্য তারা নিশ্চিন্ত ছিল। আসমা নিজের বাবা-মার মতই তাদেরকে দেখে রাখত। আলমাস না থাকায় আসমাও গ্রামে চলে যাবে। তখন বুড়ো-বুড়িকে দেখার কেউ থাকবে না। আসমার কাছে মনে হচ্ছে চারিদিক যেন ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। ঝকঝকে চাঁদকে যেন হঠাতই গ্রাস করেছে ঘুটঘুটে অমানিশা। আলমাসবিহীন ফ্লাটটাকে তার কাছে মনে হচ্ছে ভুমিকম্পে বিধ্বস্ত এক ধ্বংসস্তুপ। আর সেই ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়েছে তিন তিনটি জীবন। অথচ ক’দিন আগেও কত আলো জ্বলমল আনন্দময় সময় কেটেছে তার।

********

আসমা গ্রামে চলে যাওয়ার জন্য জিনিসপত্র প্যাকিং করে ফেলে। আবির মাকে জিজ্ঞেস করে, আমরা কোথায় যাব মা? আসমা বলে, গ্রামে, তোমার দাদুর বাড়িতে। সে আনন্দে লাফাতে থাকে। আমি দাদুবাড়িতে মাটি দিয়ে খেলব। আবার জিজ্ঞেস করে, বাবা যাবে না? আসমা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে, তোমার বাবা আগেই চলে গেছে। আবির বলে, আমি বাবার সাথে মাটি দিয়ে খেলব। আমি মাটি দিয়ে ঘর বানাব। তুমি আপুকে বলে দাও যেন আমার ঘর ভেঙ্গে না ফেলে।

চরম দুঃসময়েও আলমাসের অফিস থেকে আসমা কোন সহযোগিতা পেল না। বকেয়া বেতনও অফিস থেকে নগদ দেয়া হলো না। আসমাকে বলা হল বিকাশের মাধ্যমে পরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। আসমার দিশাহারা অবস্থার মধ্যে আলমাসের কলিগরা কোম্পানির গাড়িতে মালামাল এবং তাদেরকে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করল। এই উপকারটুকু আসমার কাছে অকুল পাথারে ডুবন্ত ব্যক্তির নিকট ভেসে আসা কাষ্ঠদণ্ডের মত মনে হল।

আসমা সমস্ত মালামাল গাড়িতে উঠানোর পর বুড়ো-বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিতে যায়। একমাসের ভাড়া বকেয়া রয়েছে। গলার চেইনটা খুলে বুড়োর হাতে দিয়ে বলে, নগদ টাকা নেই। বকেয়া ভাড়ার জন্য চেইনটা রেখে দেন। আসমার চলে যাওয়ার মুহূর্তে তাঁরা বুঝতে পারে তাঁদের মাথার উপর এতদিন ছায়া দেয়া বিশ্বস্ত ছাতাটি আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁদের গায়ে যেন সূর্যের উত্তপ্ত রশ্মি এসে পড়ছে। সীমাহীন শূন্যতা অনুভব করছেন। বুকটা হাহাকার করে উঠছে। আবির বলে, নানা, আমি দাদুবাড়িতে যাচ্ছি, বাবার সাথে মাটি দিয়ে খেলব। খুব মজা হবে। বুড়ো-বুড়ি এবার আর নিজেদের ধরে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। আবিরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বুড়ো বললেন, আমরা যে সবাই মাটির খেলনা, নানু ভাই। ভেঙ্গেচুরে মাটিতেই যে মিশে যাব। আসমাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। কান্নায়-কান্নায় পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল।

আসমা বাসা থেকে বের হয়ে গেলে বুড়ো-বুড়ি আলমাসের ফ্লাটে প্রবেশ করে। ফাঁকা বাসা দেখে তাঁদের হুহু করে কান্না আসতে থাকে। বুড়ো বলে, মেয়েটাকে আমাদের যেতে দেয়া উচিত হয়নি। একটা ফ্লাটে তারা থাকলে আমাদের কী এমন ক্ষতি হত? বুড়ি বলে, আমি মনে মনে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমাকে বলার সাহস পায়নি। হঠাতই বুড়োর হাতে থাকা আসমার গলার চেইনটা তাঁর চোখে পড়ল। এতক্ষণ তিনি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। চেইনটা তাঁর চোখেই পড়েনি। চেইনটা দেখে তাঁর কষ্ট যেন শতগুণে বেড়ে গেল। বিপদের সময় মেয়েটাকে সহযোগিতা না করে উল্টো তার গলার চেইনটা সে রেখে দিল! নিজেকে তাঁর চরম অপরাধী মনে হল। বার্ধ্যক্যের অক্ষমতা ভুলে গিয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেলেন চেইনটা ফেরত দেয়ার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে তারা অনেকদূর চলে গেছে।

গাড়ি যখন সোনারগাঁ হোটেলের কাছে চলে এল তখন মুনিয়ার বিয়াম স্কুলের সাইনবোর্ডটা চোখে পড়ল। মুনিয়া বলল, মা দেখ দেখ, আমাদের স্কুল। মুহূর্তেই আসমার চোখ সেদিকে চলে গেল। এই স্কুলের সাথে তার কত্ত স্মৃতি রয়েছে। কত আনন্দঘন সময় কেটেছে হাতিরঝিলের পাড়ে। মুনিয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে দিনের পর দিন অন্য অভিভাবিকাদের সাথে গল্পগুজব করে কত না সুন্দর সময় সে কাটিয়েছে। আর কোনদিন তাদের সাথে দেখা হবে না, মনে হতেই তার হ‍ৃদয়টা যেন দুমড়ে-মোচড়ে যাচ্ছিল।

আলমাসের হাত ধরে এই ঢাকা শহরে আসমা এসেছে। আজ আলমাস নেই, ঢাকা শহরে তার জায়গাও নেই। রাস্তায় এতলোক আছে অথচ তার আলমাস নেই। ভাবতেই বুকটা তার হাহাকার করে উঠছে। চোখ ভিজে যাচ্ছে। অশ্রুর বান নামছে। বার বার চোখ মুছেও যেন সে বান থামাতে পারছে না। মুনিয়া জিজ্ঞেস করে, মা, স্কুল যখন খুলবে তখন কি আমরা আবার আসব? আসমা কথা বলে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মুনিয়া আবার বলে, মা আমি কি আর বিয়াম স্কুলে পড়তে পারব না? আবির বলে, মা আমরা কখন দাদুবাড়ি পৌঁছব? আমি গিয়েই বাবার সাথে মাটি দিয়ে খেলব। আসমা দু’বাহুতে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুভরা চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

লেখক : উপসচিব-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *