মঙ্গলবার | ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং |

একুশে আগস্টের স্মৃতি: মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা

* মোঃ নজরুল ইসলাম বাবু *

ভয়াবহ ২১ আগস্ট রাজনৈতিক ইতিহাসের জঘন্য ও কলঙ্কিত একটি দিন। স্বাধীনতা বিরোধী বিএনপি-জামাত চক্র ওইদিন হায়নার মত গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ষড়যন্ত্র, লোভ-লালসা আর পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা যাওয়ার জন্য ওই দিন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার ঘৃণ্য মতলব হাসিল করার পাঁয়তারা করে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে বিএনপি জামাত। অনেকের মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম ২১ আগস্টের সমাবেশে।

৭৫ এর ১৫ই আগস্ট একই সূত্রের ষড়যন্ত্রকারী, ক্ষমতালোভী নরপিশাচগুলো বাংলার রাখাল রাজা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বুলেটে ঝাঁঝরা করে আমাদের কাছ থেকে চিরদিনের জন্য কেড়ে নিয়েছে। নরপিশাচগুলো ভেবেছিলো জাতির পিতাবিহীন এ বাংলাদেশটাকে ওরা নগ্ন করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে তাদের পিপাসা মিটাবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জামাত শিবির পাকিস্তানিদের রঙ্গমঞ্চের ঠিকানা হিসেবে আমার মাতৃভূমিকে অভিহিত করবে। কিন্তু না, সেখানে বাঁধ সেধেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মূর্ত প্রতীক হয়ে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরত্ম শেখ হাসিনা। তার সুযোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের কারণে ৭৫ এর খুনী চক্র বারবার বাঁধাগ্রস্ত হয়, পরাজিত হয় আর তাতেই গা জ্বালা হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারী বিএনপি জামাতের। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দখলবাজ খালেদা জিয়া এবং তার দলের বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল এবং শ্রমিক দলের ক্যাডাররা সারাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েম করে। ছাত্রদলের রাজত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের হত্যা করে। যখন পিতার কোলে শিশু হত্যা করা হয়, যখন সারা দেশে এক যোগে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে জঙ্গীবাদ উত্থান ঘটানো হয়; যখন বাংলা ভাই, শাইখ আঃ রহমানদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা দেয়া হয়, যখন খালেদা জিয়ার দুই পুত্র দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে ঠিক সে সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী কর্মসূচী গ্রহণ করেন।

২১ আগস্ট ২০০৪, দিনটি ছিল শনিবার, বোমা হামলার সেই ভয়াবহ দিনের কথা অনুভব করলে আজও গা শিউরে উঠে! বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এর সামনে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী’ সমাবেশ ছিল। তৎকালীন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা জননেত্রী শেখ হাসিনা সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখবেন। তাই সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সে সমাবেশে যোগদানের উদ্দ্যেশ্যে আমি সকালেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে চলে আসি। সময় তখন বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগুচ্ছিলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। এসময় শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়ঘাতকরা। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূণ্য করে দেওয়া। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অসংখ্য গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় রক্ত-মাংসের স্তুপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বিষয়টি বুঝতে পেরে ট্রাকে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে তাৎক্ষণিক মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা হয় বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবাণীতে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান জননেত্রী শেখ হাসিনা। বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। দেশরতœ শেখ হাসিনা, জননেতা আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, এডভোকেট সাহারা খাতুন, মোহাম্মদ হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে আমিসহ আরো কয়েকশ’ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী আহত হন। ওই সময় প্রথমে অজ্ঞান অবস্থায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে সি এম এইচ এ নেয়া হয়। সেখান থেকে সিকদার মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য জননেতা ওবায়দুল কাদের, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অজয় কর খোকন, পঙ্গজ দেবনাথসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আমাকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নেয়া হয়। ভারতে অপারেশন করে কয়েকটি প্লিন্টার বের করা সম্ভব হলেও অসংখ্য প্লিন্টার শরীরে রয়ে যায়। ভারত থেকে দেশে ফেরার পর জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। লন্ডনের অত্যাধুনিক চিকিৎসকরা মৃত্যু ঝুঁকি থাকার কারণে কয়েকটি প্লিন্টারের বেশি বের করতে পারেনি। এখনও শরীরে থাকা প্লিন্টারগুলো মাঝে মাঝে অসহনীয় যন্ত্রনা দেয়। সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আমার মতই আহত হন কয়েকশ’ মানুষ। তাদের মধ্যে যারা বেঁচে আছেন, তারাও শরীরে অসংখ্য গ্রেনেড প্লিন্টার নিয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে।

২১ আগস্টের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় এক সঙ্গে ২৪ জন মানুষকে হত্যার গুরুতর অপরাধের প্রাথমিক আইনি প্রতিকার পেতে দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপি জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। এই মামলায় খালেদার পুত্র তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে জাতির কলঙ্কের দায় মোচন হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অপরদিকে জামাত বিএনপি চক্র দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এসব চক্রান্ত্র ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে দেশরতœ শেখ হাসিনা সরকারের ডিজিটাল বাংলার আলোর মিছিলকে এগিয়ে নিতে ও বাংলাদেশের  উন্নয়নের এই অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে বাঙালীর আস্থার ঠিকানা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করি। উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,  জাতীয় সংসদ সদস্য, নারায়ণগঞ্জ-২  (২০০৮,২০১৪, ২০১৮

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *