শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

ছোট গল্প : বাবার মৃত্যুবার্ষিকী

হারাধন ১৯৭৬ সাল থেকে তার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী পালন করে আসছে। প্রতি বছরই একটা নির্দিষ্ট দিনে তার বাবার পরকালীন মঙ্গলের জন্য একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন  সে করে থাকে। তার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি থাকেতারই গ্রামের সকল ভিক্ষুক এবং দুইমসজিদের ইমাম। গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। হারাধন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হয়ে তার বাবার মৃত্যু বার্ষিকীতে হিন্দু ধর্মের  লোকজনকে দাওয়াত না দিয়ে কেন মসজিদের ইমামকে দাওয়াত দিয়ে থাকে, কেন সে অনুষ্ঠানে বেদ পাঠ না হয়ে কোরআন  পাঠ হয়, এ নিয়ে তাকে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তারা বৈষ্ণব ভোজে নিরামিষ না হয়ে মাছ-মাংস খাওয়া সহজ ভাবে নিতে পারেনি। তারা মনে করে এতে হারাধনের বাবার মঙ্গল না হয়ে অমঙ্গল হবে। তবে সেই বিরোধিতা বেশিদূর এগোয়নি। প্রথমবার ইমাম সাহেব জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার বাবা মুসলমান কিনা। সে জবাব দিয়েছিল, তার বাবার দাফন হয়েছে ইসলামের রীতি অনুসারে। তারপর ইমাম সাহেব আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করেননি। অন্য ইমাম সাহেব কোন প্রশ্নই করেননি। ইমাম সাহেব ধরেই নিয়েছিলেন তার বাবা হয়তো মুসলমান ছিলেন। দেশে হিন্দু-মুসলমানে অনেক বিয়ে-শাদী হয়ে থাকে। মুসলিম ছেলেরা হিন্দু মেয়ে বিয়ে করলেও সবাই ধর্মান্তরিত হয়না। ফলে সন্তানরা কেউ বাবার ধর্ম কেউবা  মায়ের ধর্ম পালন করে থাকে। ইমাম সাহেব সেরকমই একটা কিছু ভেবে আর কোন প্রশ্ন করেননি। তার স্ত্রী পার্বতীও বিয়ের প্রথম বছরে বাধাঁ দিয়েছিল। বিষয়টি পার্বতী পরবর্তিতে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। পার্বতী হারাধনকে বলেছিলো, তাদেরতো বর্ণভেদ আছে। ব্রাহ্মণরা তাদের রান্না খায়না। সেক্ষেত্রে মৌলানা সাহেবরা খাবেন কিনা। হারাধন পার্বতীকে আশ্বস্ত করে, মুসলমানদের মধ্যে বর্ণ প্রথা নেই। সকলেই সকলের রান্না খায়। তাছাড়া বিয়ের আগে থেকেই প্রতিবছরই সে এ অনুষ্ঠান করে আসছে। তবে হারাধন পার্বতীর কাছে সত্য গোপন করেনি।

 

হারাধনের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। একাত্তরে যদি তাদের দোকানটি লুটনা হতো,  তার ঘরবাড়ি যদি পুড়িয়ে না দিতো, জমিজমা যদি দখল করে না নিতো তাহলে হয়তো তার এমন অবস্থা হতোনা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে নাপারার দুঃখটি সে এখনো ভুলে যেতে পারেনি। বয়সে ছোট থাকায় তার মা তাকে যেতে দেয়নি।

সন্তানাদি  নেই। ষাটোর্ধ্ব বয়সেও কখনো রিকশা চালিয়ে কখনো বা দিন মজুরের কাজ করে তাকে দিন চালাতে হয়। প্রতিদিন তার আয় থেকে কিছু টাকা রেখে দেয় তার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী পালন করার জন্য। তার স্ত্রী পার্বতী স্বামীর ইচ্ছা পূরণের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি দিয়ে থাকে। অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে শেষ হলে হারাধন নিজেকে হালকা মনে করে। তার মনটা চনমনে হয়ে যায়। মেজাজ থাকে ফুরফুরে।

 

হারাধন এবারের অনুষ্ঠানের আয়োজনে একটু ঝামেলায় পড়ে গেছে। তার চাচাত ভাই ভবেশ এসেছে কোলকাতা থেকে। হারাধনের একচাচা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় কোলকাতা গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তিনি কোলকাতাতেই বিয়ে-শাদী করে স্থায়ী হয়েছেন। হারাধনের বাবা যেবছর মারা যান ঐ বছরের একই মাসে ভবেশের বাবাও মারা যান। হারাধনের চাচাত ভাইয়েরা ডিসেম্বরে তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে থাকে। চাচাত ভাই ভবেশের উপস্থিতিতে মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানের আয়োজন তাকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। কারণ ভবেশ হারাধনের বাবার মৃত্যুর প্রকৃত তারিখটা জানে। তারপরও হারাধন নাছোড়বান্দা অনুষ্ঠান করবেই। যদিও পার্বতী পরামর্শ দিয়েছে নির্ধারিত তারিখে নাকরে পরে করার জন্য। তার যুক্তি নির্ধারিত তারিখের পরে অনুষ্ঠান আয়োজনের  রেওয়াজ এদেশে আছে। যখন তার চাচাত ভাই চলে যাবে তখন অনুষ্ঠান করা যাবে। কিন্তু হারাধনের মন তাতে সায় দিচ্ছেনা। কেননা,  গত পঁয়তাল্লিশ বছর যাবত সে এ অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়েই করে আসছে। যাইহোক অনুষ্ঠান সে করবেই।

 

অনুষ্ঠানে তার অতিথিদের একটি অংশ হলো গ্রামের সকল ভিক্ষুক। তবে

গ্রামে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমে গেছে। গ্রামের মানুষের আর্থিক অবস্থা এখন বেশ ভাল। এখন কেউ আর ভিক্ষা করেনা। গ্রামে এখন মাত্র দু’জন ভিক্ষুক অবশিষ্ট আছে। তাদেরকে দাওয়াত দিতে গেলে প্রথমেই খাওয়ার মেনু জিজ্ঞেস করে। তারপর খাবে কি খাবেনা সেটা ভিক্ষুক সিদ্ধান্ত নেয়। মেনু পছন্দ নাহলে দাওয়াত খায়না। তাদের প্রথমজন বলেছে তাকে মেম্বার সাহেব দাওয়াত দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে। তাকে পোলাও খাওয়ানো হবে। কাজেই অন্য দাওয়াত নিতে সে রাজি নয়। তবে যদি সকালে খাওয়ানো হয় সে রাজী কারণ মেম্বার সাহেব খাওয়াবেন রাতে। তবে পোলাও মাংস খাওয়াতেই হবে। অন্যজনও একই কথা পোলাও-মাংস খাওয়ালে তার দাওয়াত খাবে নইলে খাবেনা। অগত্যা হারাধন রাজি হলো। পোলাও-মাংস খাওয়াবে এবং সকালেই খাওয়াবে। ইমাম সাহেবরা সকালে দাওয়াত খাননা। কিন্তু হারাধনের সমাস্যাটা বুঝতে পেরে তারাও রাজি হলেন।

 

গত ত্রিশ বছর যাবত এই দু’জন ইমামকেই হারাধন দাওয়াত করে আসছেন। গ্রামে একসময় মসজিদ একটিই ছিলে। নতুন আরেকটি মসজিদ হয়েছে তবে সেটার বয়সও ত্রিশ বছর হয়ে গেছে। যথারীতি অনুষ্ঠানে ইমাম সাহেব আসলেন। আসলেন দুই ভিক্ষুকও সুন্দর পোশাক পরে। তাদেরকে দেখে মোটেই ভিক্ষুক মনে হচ্ছেনা। তারা অন্য গ্রামে ভিক্ষা করতে গেলে নির্ঘাত মার খাবে। কারণ এতো পরিপাটি পোশাকে ভিক্ষা চাইলে ভন্ড ভিক্ষুক ভেবে গণপিটুনি দিয়ে দিবে। ভিক্ষুকদের আর্থিক অবস্থা ভাল হলেও সাধারণত তারা ছেঁড়া নোংরা কাপড়ই পরে থাকে। কারণ তার চেহারায় ভূখানাঙ্গা, রোগাক্রান্ত, জীর্ণ-শীর্ণ করুণভাব ফুটিয়ে তুলতে নাপারলে মানুষ ভিক্ষা দেয়না। এক্ষেত্রে,  মানুষের মনের অবস্থা বুঝতে পারার যথেষ্ট পারঙ্গমতা তাদের রয়েছে। প্রতিবছরই ধনী লোকেরা ভিক্ষুকদেরকে পরিধেয় বস্ত্র দান করেন। যে নতুন বস্ত্রগুলো ভিক্ষুকরা পায় সেগুলো তাদেরকে কখনো পড়তে দেখা যায়না। তাদের পরিধেয় বস্ত্র হবে সবসময়ই পুরাতন এবং নোংরা। তবে হারাধনের গ্রামের দু’জন ভিক্ষুক সবার পরিচিত বলেই তারা যে পোশাকই পরিধান করুক না কেন তাতে তাদের ভিক্ষার বাজার খারাপ হয়না। যাই হোক, ইমাম সাহেব দোয়া-কালাম পড়ে মোনাজাত করলেন। মোনাজাত শেষে খাওয়া-দাওয়া করে অতিথিবৃন্দ বিদেয় হলেন। প্রতিবছরই পার্বতী যে প্রশ্নটি হারাধনকে করে থাকে সেটি হলো যার জন্য হারাধন দোয়ার আয়োজন করে থাকে সৃষ্টিকর্তা কি তার জন্য মঙ্গল করে থাকেন?  হারাধনের উত্তর সে খারাপতো কিছু করছেনা। সৃষ্টিকর্তা সবার মনের খবর জানেন। তিনি নিশ্চয় হারাধনের মনের উদ্দেশ্যটাও জানেন এবং সে যার জন্য দোয়ার আয়োজন করে, তার মঙ্গল নিশ্চয় সৃষ্টিকর্তা করবেন।

হারাধনের চাচাত ভাই ভবেশ দোয়া অনুষ্ঠানে ছিলেন। প্রথমদিকে বুঝতে পারেননি কেন এ অনুষ্ঠান। পরে ইমাম সাহেব যখন হারাধনের বাবার মঙ্গলের জন্য দোয়া করতে থাকেন তখন তিনি বুঝতে পারেন এ দোয়া অনুষ্ঠান হারাধনের বাবার পারলৌকিক মুক্তির জন্য নয়। তবে কার জন্য সে একাজটি প্রতি বছর করে থাকে? হারাধন ভবেশকে বলতে চায়না। কিন্তু ভবেশ নাছোড়বান্দা। তাকে জানতেই হবে। প্রথমেই সে হারাধনকে জিজ্ঞেস করে কেন সে এ দোয়ার আয়োজন করে? কেন সে হিন্দুদের দাওয়াত না দিয়ে মুসলমানদের দাওয়াত দেয়। হারাধন বলেনা। হারাধন বলে সকল মানুষই সকল মানুষের জন্য দোয়া করতে পারে। সকল ধর্মের মানুষ একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। ভবেশ কিছুতেই হারাধনের নিকট  থেকে সত্যটি বের করতে পারলোনা। হারাধন যখন বাড়ির বাহিরে তখন ভবেশ পার্বতীকে ধরলো সত্যটি বলার জন্য। পার্বতীকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হলো। এও বলা হলো তার বাবা আর হারাধনের বাবা একই মাসে মারা গেছেন। তারা মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন করে ডিসেম্বরে। হারাধনের বাবার মৃত্যুবার্ষিকী কেন ভিন্ন মাসে হবে। পার্বতীর জবাব যেকোন মাসের যেকোনদিন দোয়ার আয়োজন করা যায়। ভবেশের কাছে  কোন জবাবই গ্রহণ যোগ্য হলোনা। রাতে বাড়িতে ফিরলেন হারাধন। ভবেশ এবার দু’জনকে একসাথে বসিয়ে প্রশ্ন করতে থাকেন। ভবেশের অনেক প্রশ্নেরই জবাব পাচ্ছেনা। হারাধন চেপে রাখতে পারলেও পার্বতী শেষমেষ আর চেপে রাখতে পারলোনা। বলে ফেললো-প্রকৃত পক্ষে তারা তাদের প্রকৃত বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেনা। তারা দোয়ার আয়োজন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার জন্য এবং পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্টে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য। ভবেশের শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। ঠোটঁ কাঁপতে লাগলো। ভবেশ একমুর্হুত স্তব্ধ হয়ে রইলো। পার্বতী, হারাধন এবং ভবেশের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ালো। হারাধন মনে করে পনেরই আগষ্টই তার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী।

বঙ্গবন্ধুকে অসম্ভব ভালবাসে হারাধন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের অগণিত মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তার দুর্ভাগ্য সে যুদ্ধে যেতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর অনাকাঙ্খিত নির্মম মৃত্যু তাকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। যে মানুষ আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, তার মঙ্গলের জন্য দোয়া করা মোটেই দোষের কিছুনা, তা সে যে ধর্মেরই হোক। ভবেশের প্রশ্ন মিথ্যার আশ্রয় কেন নেয়া হলো? হারাধনের জবাব মিথ্যার আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কিইবা করার ছিল তার। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ যে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো!  তারা কি কখনো দিতো হারাধনের মতো ক্ষুদ্র একজন বঙ্গবন্ধু ভক্তকে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করতে? একাত্তরের পরাজিত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের সদস্যরা যেপরাজয়ের প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে উঠেছিল। মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু পারেনি। কারণ হারাধনরা আজও আছে, হারিয়ে যায়নি।

লেখক: মোহাম্মদ জালালউদ্দিন, উপ সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সূত্র : আলোর পথযাত্রী পাঠাগার কর্তৃক প্রকাশিত “হে প্রণম্য হ পিতা”  বই থেকে..

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *