শনিবার | ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং |

ছোটগল্প : অচ্ছুত

লন্ডন স্টানস্টেড এয়ারপোর্ট থেকে ভোরে বিমানে উঠেছি। ফলে রাতের ঘুমটা একদমই ভাল হয়নি। কিন্তু বিদেশ ভ্রমনের সময় প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাজে লাগানো চাই। এয়ারপোর্ট থেকে হোস্টেলে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়েই হাটতে হাটতে চলে আসি নরওয়ের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে। পার্লামেন্ট ভবন চত্বরটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো। যদিও পার্লামেন্ট ভবনটি আমাদের সংসদ ভবনের মত সুন্দর নয়। আমি আর ফিরোজ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে একটা লোহার বেঞ্চিতে বসলাম।
শীতে জড়সড় হয়ে দু’জনে গায়ে গা লাগিয়ে বসে গল্প করছি। ইউরোপে সময়টা সামার হলেও আমাদের জন্য বার মাসই পৌষ মাসের শীতের মত। ফিরোজের মতে, ইউরোপের সামার হল আমাদের জন্য এক লেপের শীত আর উইন্টার হল দুই লেপের শীত।
একটি মেয়ে হনহন করে হেঁটে এসে আমাদের পাশের বেঞ্চিতে বসল। মেয়েটির গায়ের রঙ শ্যামলা। ছিপছিপে লম্বা। দেখতে খুবই মিষ্টি। নরওয়ের ট্র্যাডিশনাল পোশাকে তাকে খুবই সুন্দর লাগছে। মেয়েটির হাতে একটি বই। সে বসেই বই পড়া শুরু করল। একনজর তাকিয়ে দেখেই নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মশগুল হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর ফিরোজ ফিসফিস করে বলল, এই সরোজ দেখ, মেয়েটি আমাদের কথা কান পেতে শুনছে আর মাঝে মাঝেই আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। আমি ফিসফিস না করে উচ্চস্বরেই বললাম, আরে রাখ, ওই বিদেশিনী কি আমাদের কথা বুঝবে নাকি?
মেয়েটি আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছ? আমি তো থ হয়ে গেলাম। দু’জনই নিশ্চুপ। কোন কথা নেই। আমরা এতক্ষণ আজে-বাজে অনেক কথা বলেছি মেয়েটি শুনে কি মনে করছে আল্লাহ মাবুদই জানেন। মেয়েটি সরাসরি আমাদেরকে তুমি করে সম্বোধন করছে। অপরিচিত কারও সাথে যা আমরা কখনই করি না। মেয়েটি একই প্রশ্ন আবার করল। আমি জবাব দিলাম,
-আমরা বাংলাদেশী। কিন্তু আমরা বাংলাদেশ থেকে আসিনি। আমরা ইংল্যান্ডের লোটন শহর থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি।
-আমি বুঝতে পেরেছি তোমরা বেড়াতে এসেছ। টুরিস্ট ছাড়া আমি কখনও কারও সাথে বাংলায় কথা বলিনা।
আমি আর ফিরোজ একে অপরের দিকে তাকালাম। এ কেমন কথা! বাংলায় কথা বলার সাথে টুরিস্টের কী সম্পর্ক!
-বুঝতে পারলাম না। একটু বুঝিয়ে বলা যাবে কি?
-আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী। কিন্তু এদেশে যে সমস্ত বাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করে তাদের সাথে আমি কখনও মিশি না। কখনও বাংলায় কথা বলি না।
-তারমানে তুমি যে বাঙালি সেটা বাঙালিদের বুঝতে দিতে চাও না? তুমি অবাঙালি হিসেবে থাকতে চাও?
আমিও সরাসরি তুমি করেই বললাম। মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করলাম সে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। একটু স্বস্থি বোধ করলাম।
-একদম ঠিক তাই। আমি নরওয়েজিয়ান হিসেবেই থাকতে চাই। তবে বাঙালী টুরিস্ট পেলে তাদের সাথে আমি কথা বলি। কারণ তারা অল্প সময় থাকেন। তোমরা লোটনে কী কর? পড়লেখা?
-হ্যাঁ, পড়ালেখা করি।
-এখানে উঠেছ কোথায়?
-অ্যাংকার হোস্টেলে।
-ও আচ্ছা। ছাত্রদের জন্য হোস্টেলটি ভাল। বেশ সাশ্রয়ী।
-তুমি কী করছ?
-আমি বর্তমানে একটা প্রতিষ্ঠানে ফুল টাইম কাজ করছি। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। এখনও রেজাল্ট হয়নি।
-দেশে তোমার বাড়ি কোথায়? তোমার বাবা-মা কি এদেশেই থাকেন?
-আমি এ প্রশ্নগুলোর জবাব দেই না।
-কেন? তাছাড়া, তুমি এদেশের বাঙালিদেরকেও এড়িয়ে চল, কেন এমন কর?
-এ প্রশ্নেরও আমি উত্তর দিতে চাই না। কখনও কাউকে দেয়নি।
-তুমি তো বেশ রহস্যময়ী। এগুলো তো খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। প্রাথমিক পরিচয়ে মানুষ এ প্রশ্নগুলোই তো করে থাকে।
-তোমার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও আমার কাছে খুবই জটিল। তোমাদেরকে বলা যায় কিন্তু আজ বলার মত যথেষ্ট সময় আমার নেই। আগামীকাল যদি আস, তাহলে বলব।
আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। মেয়েটির কথা শোনার জন্য আগামীকাল আবার এখানে আসব? আমার খুব ইচ্ছা করছে। কিন্তু ফিরোজ না সূচক মাথা নাড়ছে। আমি ফিরোজকে অগ্রাহ্য করেই বললাম, ঠিক আছে, আগামীকাল আসব ইনশাল্লাহ। মেয়েটি উঠে হাটতে লাগল। আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার হাটার স্টাইলটা অসাধারণ। হাতব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ডান হাতে বইটি নিয়ে এক মোহনীয় ভঙ্গিতে লম্বা লম্বা পা ফেলে আস্তে আস্তে চোখের আড়াল হয়ে গেল। ফিরোজ গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, এই কী দেখছিস?
-আমি কী দেখছি সেটা তুই বুঝবি না।
-বুঝা আমার হয়ে গেছে। শোন, শুধু শুধু ঐ কৃষ্ণকলির গল্প শোনার জন্য আমি আগামীকাল আসতে পারব না। আমরা কারও বাবা-মার কাহিনী শোনার জন্য এই দেশে আসি নাই। আগামীকাল অনেক জায়গায় বেড়ানোর প্লান আছে।
-ঠিক আছে। বেড়াবো। কিন্তু বাঙালি একটা মেয়ে বাঙালিদের সাথে মিশে না। এর মধ্যেও তো কিছু শেখার থাকতে পারে, তাই না?
-ঘটনাটা আসলে সেখানে না।
-ঘটনাটা আসলে কোথায়?
-আসলে তুই ঐ কৃষ্ণকলির প্রেমে পড়েছিস।
-আরে রাখ তোর প্রেম-ট্রেম। চল এবার উঠি।
অ্যাংকার হোস্টেলে ফিরে এসে দেখি আরেক অবাক কাণ্ড। আমাদের রুমে আটটি বাঙ্ক বেড। তার দু’টিতে দু’জন তরুণী উঠেছে। তাদের সাথে পরিচিত হলাম। একজন এসেছে আমেরিকা থেকে আরেকজন জার্মানি থেকে। তরুণী দু’জন নিজেরা পরিচিত নন। আমরা খুবই অবাক হলাম। কতটুকু আইনের শাসন বা একে-অপরের প্রতি আস্থা থাকলে অপরিচিত নারী-পুরুষ একটা রুম শেয়ার করতে পারে।
একটা মাত্র বাথরুম। আটজন বোর্ডার। তাও আবার দু’জন মহিলা। আমরা দু’জন ছাড়া অন্যরা সবাই একা একা। বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্নজন এই নিশীথ সূর্যের দেশে বেড়াতে এসেছে। তবে সবাই ছাত্র। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল তরুণী দু’জনকে জিজ্ঞেস করি, ছেলেদের সাথে একটা রুমে থাকার সাহস তারা কীভাবে করল? কিন্তু প্রশ্নটি আর করা হয়নি। পরদিন আমরা ঘুম থেকে উঠার আগেই তারা হোস্টেল ছেড়েছে।
পরদিন সকাল থেকেই হপ-অন-হপ-অফ বাসে চড়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্ট স্পট এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে ঘুরতে থাকি। বিকালের দিকে টায়ার্ড হয়ে গেলে হোস্টেলে ফিরে আসি। কিন্তু আমার মাথায় সারাদিন ঘুরপাক খেতে থাকে ঐ মেয়েটির কথা, যার রহস্যজনক কথা শোনার জন্য আজ বিকালে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ফিরোজকে বললাম, চল পার্লামেন্টের দিকে যাই। মেয়েটির কথা শুনে আসি।
-আরে রাখ তো তোর প্যাঁচাল। ঐ টঙটঙে মেয়েটি কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে যে সেটা শোনার জন্য টায়ার্ড শরীর নিয়েও সেখানে যেতে হবে?
-নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালি একটা মেয়ে থাকতে চায় অবাঙালি হয়ে। আমরা বাঙালিরা কী দোষ করলাম সেটা জানা নিশ্চয় গুরুত্বহীন নয়। তাছাড়া তুই দেশে চলে গেলেও আমি তো ইউরোপেই থেকে যাব। কাজেই আমার জন্য বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
-তোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে তুই একাই যা। এই আমি শুয়ে পড়লাম।
বাধ্য হয়ে আমি একাই রওনা হলাম। বেশি দূরে নয়। তারপরও অচেনা একটা দেশে একা একা রাস্তায় হাটতে একটু ভয় ভয় লাগছিল, পাছে আবার পথ ভুলে হারিয়ে না যাই। পথ ভুল হল না। দেখলাম মেয়েটি বসে বই পড়ছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, কেমন আছ?
-সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেশ টায়ার্ড হয়ে গেছি। মাথা ঝিমঝিম করছে। চল কফি খাওয়া যাক।
-ঠিক আছে চল। তোমার বন্ধু আসলো না কেন?
-সে রেস্ট নিচ্ছে।
-বুঝতে পারছি তার আগ্রহ নেই আমার কথা শোনার। তবে একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। কারণ একান্ত ব্যক্তিগত কথা বেশি লোককে বলা যায় না।
-আচ্ছা তোমার নামটাও কিন্তু এখনো বলনি। না, সেটাও নিষেধ?
-নিষেধ তো বটেই। তবে আজ যেহেতু কথা দিয়েছি বলব, কাজেই সবই বলব। -আমার নাম আসমানী। নামটা নকল নয়। জন্মের পরই যে নামটা পেয়েছি সেটাই রয়েছে।
-আমার নাম সরোজ।
আমরা একটা রেস্টুরেন্টের সামনে থামলাম। আসমানী ক্যাপুচিনোর অর্ডার দিল। আমাকে লাতে দিতে বললাম। আমরা মুখোমুখি বসেছি। আসমানীর সাথে এতক্ষণ কথা বললেও সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা হয়নি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ যেন ঝলসে গেল। এত সুন্দর চোখ এ জীবনে আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। মুখের গড়ন এত সুন্দর, কালো না হয়ে সে যদি ফর্সা হত তাহলে ভারতীয় হার্টথ্রুব নায়িকাদের সকলেই তার কাছে হেরে যেত। কফিতে চুমুক দিয়েই আসমানী তার কথা বলতে শুরু করল-
আমি প্রথমবারের মত আমার একান্ত নিজের কথা অন্যকে বলছি। এর আগেও আমি বিভিন্ন টুরিস্টের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু তখন আমি কৌশলে অনেক কিছু এড়িয়ে গেছি। আজ কোন কিছুই গোপন করব না। সরোজ, আমি আজ যা বলব তোমার কাছে তা সত্যি নাও মনে হতে পারে। তবে সেখানে বিন্দু পরিমাণ মিথ্যা থাকবে না।
আসমানী এখানে একটু থামল। তার গলাটা মনে হল একটু আর্দ্র হল এবং চোখও কিছুটা জলপূর্ণ মনে হল। কিন্তু সাধ্যমত আড়াল করে সে বলতে শুরু করল-
শেরপুর জেলার কুতুবপুর গ্রামে হঠাৎ এক বাক প্রতিবন্ধী তরুণী চলে আসে। কথা বলতে পারে না বলে তার নাম-পরিচয় বা ঠিকানা কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। গ্রামের এবাড়ি-সেবাড়ি ঘুরে সে ভিক্ষা করে চলে। যখন যেখানে খুশি থাকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সে গর্ভবতী হয়ে যায়। সন্তানসম্ভাবনা অবস্থায় গ্রামের এক গৃহস্থ তাকে আশ্রয় দেন। কৃষকের গোয়াল ঘরের একপাশের ছাপড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়। সেই ছাপড়াঘরেই সে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে।
গৃহস্থ চেয়েছিলেন শিশুটিকে কারও কাছে দত্তক দিয়ে দিতে। পিতার পরিচয়হীন একটা জারজ শিশু সমাজে লালন-পালন করা কৃষকের জন্য অমঙ্গলজনক মনে করে এক নিঃসন্তান পরিবারকে তিনি দত্তক দিয়ে দেন। কিন্তু সেই প্রতিবন্ধী মহিলা সন্তানের জন্য এমন কান্নাকাটি শুরু করে শেষে সেই কৃষক শিশুটিকে ফেরত আনতে বাধ্য হন। সেই প্রতিবন্ধী নারী পরম মমতায় শিশুটিকে আগলে রাখে। সেই গৃহস্থও প্রতিবন্ধী নারী এবং শিশুটিকে পরিবারের সদস্য করে নেন। গৃহস্থ শিশুটির নাম রাখেন আসমানী। গৃহস্থ মনে করতেন শিশুটি আসমান থেকে এসেছে। সেজন্য তার নাম আসমানীই হওয়া উচিত। সেই নামটি আমি ধরে রেখেছি আজ অব্দি। চেন্জ করিনি।
আসমানী এখানে থামল। কয়েক মিনিট নীরবতা। এবার সে অশ্রু গোপনের চেষ্টা করল না। টিস্যু পেপারে চোখ মুছল। আমারও মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরুল না। কী বলব ভেবে পেলাম না। আসমানী স্বাভাবিক হল। আবার বলতে শুরু করল-
সেই পরিবারেই আমি বড় হতে থাকি। ঐ গৃহস্থকে আমি নানা ডাকতে থাকি। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে তিনি আমাকে ভর্তি করে দেন। গ্রামের অন্যান্য শিশুদের সাথেই আমি স্কুলে যাই-আসি। গ্রামময় ঘুরে বেড়াই। পুকুরে সাঁতার কাটি। বিল থেকে শাপলা তুলি। গ্রামের সমবয়সীদের সাথে হেসে-খেলেই আমার দিন কাটতে থাকে। গ্রামের স্কুল থেকেই আমি পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে ফেলি। নানা পাশের গ্রামের নয়ানপুর হাইস্কুলে আমাকে ভর্তি করে দেন।
হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর পরই বুঝতে পারি আমি সমাজের অবাঞ্চিত এবং অচ্ছুত একজন মানুষ। ছোট থেকে যাদের সাথে বড় হয়েছি তারা আমার সাথে মিশে না। আমার সাথে কথা বলে না। ক্লাসে আমি যে বেঞ্চে বসি সেই বেঞ্চে আর কেউ বসতে চায় না। সবাই যখন গল্পগুজব করে, নিজেদের মধ্যে আড্ডা দেয় আমি সেখানে গেলেই সবাই সরে যায়। প্রাইমারী স্কুলে একসাথে যাদের সাথে পাঁচ বছর লেখাপড়া করেছি তারা যখন আমার সাথে কোন কথা বলে না, দূরে সরে যায়, তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসতে থাকে।
যাদের সাথে হাইস্কুলেই প্রথম দেখা তারা প্রকাশ্যে দূর দূর করে- তুমি আমাদের কাছে আসবে না। শিক্ষকরাও আমাকে দেখতে পারত না। এমনভাবে তাকাত যেন নোংরা কোন বস্তুর দিকে ভুলে তার দৃষ্টি চলে গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও আমি একা একা স্কুলে যেতাম। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতাম। ছুটির পর মুখে ওড়না পেঁচিয়ে একা একা বাড়ি চলে আসতাম।
গ্রামের কারও সাথে দেখা হলে ছি ছি করত। মুখ আড়াল করে ফেলত। অনেকেই পুঙ্গা (জারজ) বলে গালিগালাজ করত। ছোট সময় খেলতে খেলতে যখন কোন বাড়িতে গিয়েছি তখন আমাকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। কেন এমন করেছে আমি তখন বুঝতে পারিনি। পরে সেটা বুঝতে পারি। আমাকে দেখলে নাকি তাদের অমঙ্গল হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। আমি কারও সামনে যেতে পারতাম না। কোথাও গেলে চোখ-মুখ ঢেকে যেতে হত। এরকম অবস্খার মধ্যেই আমি সিক্স পাশ করি।
সেভেনে আমার আর পড়া হয়নি। স্কুল থেকে নানাকে জানিয়ে দেয়া হয়, তারা আর আমাকে পড়াতে পারবে না। অনেক অভিভাবক স্কুলে কমপ্লেইন করেছে- কোন জারজ মেয়ের সাথে তাদের মেয়েরা পড়বে না। যদি আমাকে রাখা হয়, তাহলে তাদের মেয়েদের এই স্কুল থেকে নিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করাবে।
আমি বাড়িতে বন্দি হয়ে যাই। আমি স্কুলে যাচ্ছি না দেখে আমার মা কান্নাকাটি করে অস্থির করে তুলে। তাকে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। কিছুদিন পর মা মারা যায়। আমি হয়ে যাই একা।
আসমানী থামল। তার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। গলা যেন বসে গেল। কথা বেরুচ্ছে না। স্বাভাবিক হতে বেশ সময় নিল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। তারপর আবার শুরু করল-
গোয়াল ঘরের পাশেই কয়েক পাতা টিনের তৈরি ছাপড়া ঘরেই আমরা মা-মেয়ে থাকতাম। মা মারা যাওয়ার পর একা থাকতে ভয় লাগছিল। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, কোত্থেকে জানি একটা কুকুর এসে গোয়াল ঘরে বাসা বেঁধেছে। আমার দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ায়, গো গো আওয়াজ করে। আমি কোথাও গেলে সেও সাথে সাথে যায়।
গ্রামের কিছু দুষ্ট ছেলের কুনজরে পড়ে যাই। রাতে তারা আমার ঘরে ঢুকার চেষ্টা করে। কুকুরটি আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। কেউ ঘরের কাছে আসলেই কুকুরটি উচ্চস্বরে ঘেউ ঘেউ শুরু করে। ফলে কেউ ঘরের দরজার কাছে ভিড়তে পারে না। একদিন কুকুরটিকে তারা লাঠি দিয়ে মেরে পা ভেঙ্গে দেয়। আমি নানাকে বলি, আমি গোয়াল ঘরে আর একা থাকতে পারব না। আমাকে তোমাদের ঘরের মেঝে থাকার একটু ব্যবস্থা করে দাও।
আমি নানা-নানীর ঘরের মেঝেতে থাকি। নানা-নানীও আমাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আমাকে বলেন, তোকে যদি ছোট সময় এতিমখানায় রেখে আসতে পারতাম তাহলে তোর জীবনে এরকম কোন সমস্যা হত না। এতিমখানার বাচ্চাদের বাবা-মার পরিচয় নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সবাই সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে। তোর মার কারণে আমি তোকে এতিমখানায় দিতে পারি নাই। এখন তোকে নিয়ে কী যে করি। বিয়ে-শাদী কোথাও দিতে পারব বলেও মনে হয় না। যতদিন আমরা বেঁচে আছি তুই আমাদের সাথেই থাকতে পারবি। কিন্তু আমরা মারা গেলে.. নানা থেমে গেলেন।
তাদের কাছেই জানতে পারি বিদেশে বাবার পরিচয় ছাড়াই অনেক শিশু বড় হয়। আমার জন্ম ইউরোপ-আমেরিকায় হলে কোন সমস্যাই হত না। আমি প্রতিদিন কোরআন শরীফ পড়তাম। নামাজ পড়তাম আর কান্না-কাটি করতাম। মনে মনে চাইতাম যদি বিদেশে চলে যেতে পারতাম তাহলে দুনিয়াতে বেঁচে থাকা যেত।
একদিন পাশের বাড়িতে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। আমি চুপি চুপি দেখতে যাই। কিন্তু মেয়ে পক্ষের লোক আমাকে দেখে চিনে ফেলে। আমাকে বিশ্রী ভাষায় গালি-গালাজ করে। মেয়ের মা এসে আমার চুলের মুঠি ধরে গালে পিঠে চড়-থাপ্পর মারতে থাকে। আমি কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি। আমার এত খারাপ লাগতে থাকে যে, সারারাত কান্না-কাটি করি। আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছা চলে যায়।
ঘরে বিষ আছে আমি জানতাম। নানা ফুলকপি ক্ষেতে দেয়ার জন্য কিনে রেখেছেন। রাতেই বিষ খাব বলে মনে মনে ঠিক করে ফেলি। বিষের বোতলটি হাতে নিই। ঠিক তখনই কুকুরটি উচ্চস্বরে ঘেউ ঘেউ করা শুরু করে। এমনভাবে আগে কখনও তাকে আওয়াজ করতে শুনিনি। আমার কাছে মনে হচ্ছিল সে আমাকে শাসন করছে। সুইসাইড করতে নিষেধ করছে। নানা-নানীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি স্বস্থানে বিষের বোতল রেখে দিই। বিষের বোতল হাতে নেয়ার সাথে সাথে কুকুরের আগমন এবং উচ্চস্বরে ঘেউ ঘেউ ডাক আমার কাছে রহস্যজনক মনে হয়। আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি।
পরদিন সকাল দশটার দিকে একটি জিপ গাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই এসে থামে। গাড়িটি থেকে একজন বিদেশী মহিলাকে নেমে লোকজনের সাথে কথা বলতে দেখি। আমি দৌড়ে গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরি, আর বলতে থাকি- তুমি আমার মা, তুমি আমার মা। আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চল। নইলে আমি বিষ খেয়ে মরে যাব। মহিলাটি হতভম্ভ হয়ে যায়। আমাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু আমি ছাড়ি না। চারপাশ থেকে লোক জড়ো হয়ে যায়। লোকজন জোর করে আমাকে ছাড়িয়ে দেয়। মহিলাটি তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে চলে যায়।
বিদেশী মহিলার পা জড়িয়ে ধরার বিষয়টি আমার মাথায় কীভাবে আসল তা আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। আমার কুকুরটিকেও ঐ সময় দেখি আমার চারপাশে ঘুরছে, লেজ নাড়ছে আর আমার গা ঘেঁষে দাড়িয়ে গো গো আওয়াজ করছে। দেখলাম তার ভাঙ্গা পা ভাল হয়ে গেছে। কুকুরটিকে দেখে আমি ভরসা পাই। মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটবে।
দু’দিন পর সেই বিদেশী মহিলা আবারও গ্রামে আসে। জানতে পারি তিনি আমার বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে এসেছেন। লোকজনের কাছে শুনে তিনি আমাকে দত্তক নেয়ার জন্য আগ্রহী হয়েছেন। তিনি বাংলা বুঝেন কিন্তু তেমন বলতে পারেন না। আমি এবং নানা তার সাথে কথা বলি।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই দত্তক নেয়ার কাগজপত্র তিনি রেডি করে ফেলেন। নানার স্বাক্ষর নিয়ে আমাকেসহ ঢাকায় চলে আসেন। নতুন মার সাথে মাস খানেক আমি ঢাকায় থাকি। তারপর তিনি আমাকে নিয়ে নরওয়ে চলে আসেন।
আমি এখানে নতুন করে পড়ালেখা শুরু করি। নিজ দেশের মানুষের কাছে সারাজীবন তো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর অবহেলার পাত্রীই ছিলাম। এদেশে মানুষের সুন্দর ব্যবহার দেখে আমার চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারতাম না- মানুষ এত ভাল হতে পারে। আমার জন্ম কোথায়, আমার বাবা আছে কি নাই, সেটা নিয়ে একটি শব্দও এ যাবত কারও কাছে শুনিনি। আমার মাতৃভূমির সহপাঠীদের ব্যবহারের সাথে এদেশীয় সহপাঠীদের ব্যবহারের তুলনা করে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই- কোথায় ছিলাম আর কোথায় আছি।
আমি লেখাপড়ায় খুবই ভাল করেছি, সরোজ। অনার্সে আমি রেকর্ড মার্কস পেয়েছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা আর গবেষণা করার ইচ্ছা। বিশ্ববাসীর মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করব। কারও সাথে কোন বন্ধনে জড়ানোর ইচ্ছা আমার নেই।
কুতুবপুর গ্রাম থেকে চলে আসার দিন আমি নানা-নানীর চোখে-মুখে যে আনন্দ দেখেছি অতীতে তা আমি কখনও দেখিনি। অনেকেই সেদিন জড়ো হয়েছিল কিন্তু কেউ আমার জন্য একটুও মন খারাপ করেনি। বরং আমি গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছি সেজন্য তারা যেন স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলছিল। সেদিন শুধু কেঁদেছে আমার কুকুরটি। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ার দৃশ্য আমি দেখেছি। গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়ে দৌড়ে হাইওয়ে পর্যন্ত সে চলে এসেছিল।
আসমানী থামল। চোখ তার অশ্রুসিক্ত। টিস্যু পেপারে চোখ মুছতে মুছতে বলল, এবার বল, বাঙালিদের মাঝে মিশে যাওয়ার মত আত্মবিশ্বাস কি আমার থাকা উচিত? আর আমি যদি মিশেও যাই, তাহলে এখানেও যে কুতুবপুরের মত অবস্থা হবে না তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে?
আমি জবাব দিতে পারলাম না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আসমানী আবার বলতে শুরু করল-
আমার মা কথা বলতে পারত না। বাংলাকে আমি সেই অর্থে আমার মায়ের ভাষা বলতে পারি না। কিন্তু বাংলায় কথা বলার জন্য আমি ছটফট করি। ইচ্ছে হয় বাল্যকালের স্মৃতিগুলো কারও সাথে রোমন্থন করি। কিন্তু কার সাথে কথা বলব? নানা-নানী আর কুকুরটি ছাড়া আপনজন বলতে চতুর্থ কোন প্রাণি আমি দেশে রেখে আসিনি। ঐ তিনটি প্রাণির কী অবস্থা আমি সেটাও জানি না। এতদিনে হয়ত সবাই ইহকাল ত্যাগ করেছে। আমার যখন বাংলায় কথা বলতে ইচ্ছে হবে, আমি তোমাকে ফোন দিব, সরোজ।
আমি আজ উঠতে চাই। তোমার আপত্তি না থাকলে আমি তোমাকে হোস্টেল পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারি।
আমি তার পাশের সিটেই বসলাম। আসমানী সা করে তার গাড়িটি টান দিল। অ্যাংকার হোস্টেলের সামনে আমি নামলাম। আসমানীকে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম। তার শ্বেত শুভ্র গাড়িটি যতক্ষণ না দৃষ্টি সীমার বাইরে গেল, ততক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম, নিয়তির কি নির্মম খেলা- জন্মভূমিতে যে ছিল অচ্ছুত, পরভূমে তার কত নির্বিঘ্ন পদচারণা। আসমানী যখন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী হবে, তখন বাঙালি হিসেবে আমার কি তাকে নিয়ে গর্ব করার অধিকার থাকবে? আমি ধন্ধে পড়ে গেলাম।
লেখক : মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, উপ প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন।

 

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *